রুণা খামারু: দশ বছর আগে ২০১৫ সালে শুরু হয়েছিল পথ চলা, এবার আরও বড় আকারের প্রশাসনিক ভবন গড়ে উঠল পূর্ব মেদিনীপুর কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রে। সেইসঙ্গে নির্মাণ করা হয়েছে একটি দ্বিতল কৃষক আবাসও। এই উপলক্ষে ২৪ আগস্ট, রবিবার সেজে উঠে উঠেছিল নন্দকুমারের দয়ালদাসী মূলাখোপ এলাকায় পূর্ব মেদিনীপুর জেলার কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র চত্বর। ফিতে কেটে, মোমবাতি জ্বালিয়ে, নারকেল ফাটিয়ে শুভ উদ্বোধন হয় এখানকার বহু প্রতিক্ষিত প্রশাসনিক ভবন ও কৃষক আবাসের।

উদ্বোধন করেন দিল্লির আইসিএআর বা ভারতীয় কৃষি গবেষণা পরিষদের ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল (কৃষি সম্প্রসারণ) ড. রাজবীর সিংহ ও বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অশোক কুমার পাত্র। উপস্থিত ছিলেন পূর্ব মেদিনীপুর কেভিকে-র বরিষ্ঠ বিজ্ঞানী ও প্রধান ড. সামসুল হক আনসারি, আইসিএআর কলকাতার কৃষি প্রযুক্তি ব্যবহার গবেষণা কেন্দ্রের ডিরেক্টর ড. প্রদীপ দে, বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিরেক্টর অফ এক্সটেনশন এডুকেশন প্রফেসর শুভেন্দু বিকাশ গোস্বামী, হলদিয়া রামকৃষ্ণ-সারদা মিশন আশ্রমের স্বামী বিবেকাত্মানন্দজি মহারাজ, হলদিয়া এনার্জি লিমিটেডের ভাইস প্রেসিডেন্ট ও প্লান্ট হেড শ্রী সুশোভন পাত্র, নন্দকুমারের বিধায়ক শ্রী সুকুমার দে এবং ঝাড়গ্রাম, হাওড়া, হুগলি ও নদিয়া কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের সিনিয়র সায়েনটিস্ট ও প্রধান প্রমুখ।

এদিনের অনুষ্ঠানে বৃক্ষ রোপন কর্মসূচিও নেওয়া হয়। পূর্ব মেদিনীপুর কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র চত্বরে দুটি বৃক্ষচারা রোপন করেন দিল্লি আইসিএআর-এর ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল (কৃষি সম্প্রসারণ) ড. রাজবীর সিংহ ও বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অশোক কুমার পাত্র। পাশাপাশি অনুষ্ঠানে আগত সকল অতিথিদের একটি করে চারাগাছ উপহার দেওয়া হয়।

এই কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের নতুন প্রশাসনিক ভবনে দক্ষিণবঙ্গের সবকটি কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের তরফে স্টল দেওয়া হয়। সেখানে প্রদর্শন করা হয় জেলার কৃষকদের উৎপাদিত কৃষিজ পণ্য সামগ্রী। সবকটি স্টল ঘুরে দেখে কৃষি উৎপাদন সম্পর্কিত তথ্য জানতে সংশ্লিষ্ট জেলাগুলির কেভিকে প্রধানদের সঙ্গে কথা বলেন দিল্লি আইসিএআর-এর ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল (কৃষি সম্প্রসারণ) ড. রাজবীর সিংহ সহ অন্যান্য বিশিষ্টরা।

নবনির্মিত প্রশাসনিক ভবনের সেমিনার হলে মূল অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। আগত বিশিষ্টদের বরণ করে নেওয়ার পর প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও উদ্বোধনী সংগীতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সূচনা হয়। তারপর পূর্ব মেদিনীপুর কেভিকে-র অ্যাচিভমেন্ট ও নানা কর্মকাণ্ড নিয়ে দুটি বইয়ের উদ্বোধন করা হয়। এরপর কেভিকে-র পরামর্শ ও সাহায্য নিয়ে যে সব কৃষকরা সফল হয়েছেন তাঁদের পুরস্কৃত করা হয় অনুষ্ঠানে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন পূর্ব মেদিনীপুরের সাত জন এবং ঝাড়গ্রামের দুজন কৃষক।

অনুষ্ঠানে আইসিএআর-এর ডেপুটি ডিরেক্টর জেনারেল (কৃষি সম্প্রসারণ) ড. রাজবীর সিংহ বলেন, “এই কেভিকে-র টিমের কর্মীদের মধ্যে কাজ করার মানসিকতা ও উদ্যম যে রয়েছে সেটা নজরে এসেছে। তাই এই কেন্দ্রকে অন্যতম সেরা প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। জেলার পরিস্থিতি ও দিশা বদলানো যেতে পারে আমাদের সবাই যদি মন-প্রাণ দিয়ে কাজ করি।” তিনি জানান, মে-জুন মাসে যে ‘বিকশিত কৃষি অভিযান’ কর্মসূচি নেওয়া হয়েছিল তাতে বাংলার সাফল্য দিল্লিতে বিশেষভাবে চর্চিত হয়েছে। তাই বাংলায় যা যা কাজ হচ্ছে তার সবই দিল্লি পর্যন্ত পৌঁছয় বলে জানান। বলেন, “কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রগুলিকে কী করে আরও শক্তিশালী করা যায় তা নিয়ে আমরা পুরোপুরি সমর্পিত রয়েছি, যা যা সমস্যা আসছে তা সবই মেটানোর আপ্রাণ চেষ্টা করা হয়।” এছাড়া যে কৃষকরা এদিন পুরস্কার পান তাঁদের শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “শুরুতে সব কাজেই সমস্যা থাকে, পরে ধীরে ধীরে সাফল্য আসে তাই সবাই মিলে এককাট্টা হয়ে কাজ করতে হবে।” এছাড়া নবনির্বিত ভবনের পরিকাঠামো উন্নয়নে আর যা যা ঘাটতি থেকে গেছে তা দ্রুত পূরণ করার নির্দেশ দেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে।[/caption]

বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. অশোক কুমার পাত্র অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে পূর্ব মেদিনীপুর কেভিকে-র সমস্ত কর্মী ও চাষি ভাইবোন যাঁরা বিভিন্ন জায়গা থেকে এসেছেন এবং যাঁরা পুরস্কৃত হয়েছেন তাঁদের সবাইকে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানান। বলেন, “আপনারা সবাই খুব ভালো কাজ করছেন। আজকের এই শুভ দিনটা আমাদের কাছে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। সবাই ভালো মনে এগিয়ে আসুন ভালো কিছু করার তাগিদে। এখানকার কৃষকদের অনেক এগিয়ে নিয়ে যাওয়া যাবে। এখানে এতো জমি, জলাশয়ের মতো প্রাকৃতিক সম্পদ রয়েছে সেইসব নিয়ে প্রযুক্তিকেও কাজে লাগিয়ে কৃষির উন্নয়ন করতে হবে একত্রিতভাবে।” পাশাপাশি কৃষিকাজে যে ভালো ভালো কাজ হচ্ছে তা তুলে ধরার জন্য সংবাদমাধ্যমের কর্মীদের অনুরোধ করেন তিনি।

নন্দকুমারে বিধায়ক শ্রী সুকুমার দে এদিনের অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন পূর্ব মেদিনীপুর কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র গড়ে তোলার ইতিহাস। বলেন, “নন্দকুমার এলাকার মানুষ এখন বুঝেছেন এটার গুরুত্ব কতটা। আগে এগুলো তাঁরা বোঝেননি। ২০০৮ সালে আমি পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি। তখন এসে দেখলাম, একটা ছোট্ট ঘর অনেক দূরে, কোনও পাঁচিল নেই। এখানে যাঁদের কৃষি জমি ছিল, তা নিয়ে নানা আন্দোলন হয়, নানা প্রতিবন্ধকতার সৃষ্টি করা হয়, যাতে এই কেন্দ্র গড়ে না ওঠে। সেদিন কিন্তু প্রশাসনের সাহায্য নিয়ে এই কেন্দ্র গড়ে উঠুক তা চেয়েছিলাম। এখন এটি জেলা, অবিভক্ত মেদিনীপুর তথা রাজ্যের গর্ব। যাদের কৃষি জমি ছিল এখানে অনেকেই রাতের অন্ধকারে বিল্ডিং ভেঙে দিয়েছিলেন। পঞ্চায়েত সমিতি থেকে ফান্ড বরাদ্দ করে এবং ডিএম অফিস থেকে সরকারি টাকা দিয়ে তাঁদের প্রাপ্য মিটিয়ে দেওয়া হয়। আমরা বদ্ধপরিকর ছিলাম এটাকে গড়ে তুলতে। যাঁরা এটা গড়তে আসহযোগিতা করেছিলেন পদে পদে বাধা দিয়েছিলেন তাঁরা আজ বুঝতে পারছেন যে এই কেন্দ্রের কতটা দরকার ছিল। আগামী দিনে এর কলেবর আরও বৃদ্ধি পাবে। এটা আমাদের কাছে বিরাট প্রাপ্তি।”

সেইসঙ্গে কৃষির উন্নয়ন কতটা জরুরি তাও তুলে ধরেন। তাঁর কথায়, “কৃষি আমাদের সম্পদ, ভিত্তি, জীবন, গৌরব, সম্মান, অগ্রগতি, সুখ, সমৃদ্ধি সব। কৃষি না থাকলে মানুষ বাঁচবে না। তাই কৃষি আমাদের কাছে গর্বের।” পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনে কৃষির ভূমিকাকে অবজ্ঞা করার মানসিকতার কথাও উল্লেখ করেন। তাই প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষায় কৃষিতে আরও যত্নবান হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। এই প্রতিষ্ঠান গড়তে যাঁরা আগে বাধা দিয়েছিলেন তাঁদের উদ্দেশ্যে আবারও বার্তা দেন স্থানীয় বিধায়ক। তাঁর কথায়, বিরোধিতা না করে, কোনও দাবি থাকলে তা জানতে হয় সমাধানের জন্য। তাই সমাজ ও পরিবেশের কথা ভেবে এই সম্পদকে রক্ষা করার জন্য আর বিরোধিতা না করার আহ্বান জানান। তা করলে পদক্ষেপ নেওয়ার হুঁশিয়ারি দেন তিনি।

পরে পূর্ব মেদিনীপুর কেভিকে-র বরিষ্ঠ বিজ্ঞানী ও প্রধান ড. সামসুল হক আনসারি জানান, এই কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্রের পথ চলা শুরু হয়েছিল মূলত ২০১৫ সালে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে ২৬ একর জমি নিয়ে। নানারকম সমস্যা ও বাধা ছিল প্রথম দিকে, সেগুলি কাটিয়ে এগিয়ে চলে এই কৃষি বিজ্ঞান কেন্দ্র। আগে এখানে যাঁরা দায়িত্ব পালন করেছেন তাঁদের সবাইকে ধন্যবাদ। যাঁরা এখানকার নানা সমস্যা নিরসনে অতীতে পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে সাহায্য করেছেন, পাশে থেকেছেন তাঁদের নাম উল্লেখ করে ধন্যবান জানান। বিডিও থেকে পুলিশ প্রশাসন ও নন্দকুমারের বিধায়ক সবার কাছেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন এই কেন্দ্রকে সুরক্ষিত জায়গায় পৌঁছে দেওয়ার জন্য। আরও আর্থিক সাহায্যের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে অনুষ্ঠানের মাধ্যমে অনুরোধ করেন তিনি। বলেন, “আইসিএআর-এর গাইডলাইন মেনে কৃষি প্রযুক্তি সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে কৃতিত্বের ছাপ রেখেছে এই কেন্দ্র। জেলার ২৫ হাজারের বেশি কৃষক, কৃষিজীবী মহিলা, স্বনির্ভর গোষ্ঠী, গ্রামাঞ্চলের যুব সম্প্রদায়কে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। এক বছরের ৯টা ডেইজি কোর্স কমপ্লিট করার পথে, এতে ৩২০ জন ইনপুট ডিলারদের হাতেকলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে।” এছাড়া নানা স্কিমে কৃষিকাজে জেলার কোথায় কী সাফল্য মিলেছে ও আগামীদিনের পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন তিনি।
