শ্যামল মুখোপাধ্যায়: উন্নয়ন, উন্নয়ন এবং উন্নয়ন। এবারের রাজ্য বাজেটের অভিমুখ ও গতিমুখ এই একটাই। রাজ্যের উত্তর থেকে দক্ষিণে, পাহাড় থেকে সাগর উন্নয়নের লহর বয়ে যাবে সর্বত্র। আর তাই, ২২ জুন, ক্ষমতাসীন বিজেপি সরকারের অর্থমন্ত্রী, স্বপন দাশগুপ্ত বিধানসভায় বাজেট পেশ করার আগেই সমাজের সর্বস্তরের প্রতিনিধিত্বদের সাথে দফায় দফায় বৈঠক করছেন। জানতে চাইছেন, রাজ্যের বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরত নেতৃস্থানীয় প্রতিনিধিরা সরকারের কাছে কী কী দাবিসনদ পেশ করতে চান। রাজ্যের অতি ঠান্ডা মাথার অর্থমন্ত্রী আর্থিক বিষয়ে বিশেষত, উচ্চপদস্থ সরকারি কর্তাদের পাশে বসিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা ধৈর্য ধরে শুনছেন, নোট নিচ্ছেন বিভিন্ন ক্ষেত্রের মানুষজনের চাহিদার সম্পর্কিত নানা বক্তব্যের। শুধু কলকাতা শহরে বসেই নয়, অর্থমন্ত্রী, সদলবলে ছুটে যাবেন দুর্গাপুর, শিলিগুড়ি এবং পাহাড় এলাকাতেও। অর্থমন্ত্রী জানতে চাইছেন, মানুষের আশু প্রয়োজনীয় সমস্যা কী? কোন কোন ক্ষেত্রে আরও গুরুত্ব দেওয়া দরকার। রাজ্য বাজেটে কোন কোন ক্ষেত্রে আরও বেশি আলো ফেলতে হবে, তার দিশা চান অর্থমন্ত্রী। কেতাবী তত্ত্বে, জোড়া কিছু পরিসংখ্যান দিয়ে এবং বাজেটে নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে গতানুগতিক পদ্ধতিতে দায়সারাভাবে অর্থ বরাদ্দ করেই কাজ শেষ করতে চাইছেন না স্বপন বাবু- রাজ্যের অর্থমন্ত্রী। রাজ্য সরকারের, বিশেষ করে, রাজ্য অর্থ দফতরের স্পষ্ট বক্তব্য, এবারের বাজেট হবে পরিপূর্ণভাবেই সাধারণ মানুষের বাজেট। মানুষের আর্থ-সামাজিক সমস্যা, গরিব মানুষের পেটের ক্ষুধা, তাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খেত খামারে কাজের অগ্রগতি, সব সমস্যারই দিক নির্দেশ থাকবে এই রাজ্যের প্রথম বিজেপি সরকারের পূর্ণাঙ্গ বাজেটে- এটাই চায়, বর্তমান সরকার।
রাজ্যের অর্থমন্ত্রী চাইছেন, মানবসম্পদের উন্নয়ন। বিকশিত ভারত ২০৪৭, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মযজ্ঞ, দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের প্রকল্পগুলিতে জোয়ার আনতে চাইছে রাজ্য সরকার। রাজ্যের অর্থমন্ত্রীর স্পষ্ট কথা, “ট্রেড মিলে” দৌড়াতে দৌড়াতে বাজেট করার মত, হাস্যকর, হালকা, মূর্খের মতো কাজ নয়। একটা দেশের অথবা রাজ্যের সার্বিক উন্নয়নে বাজেট হচ্ছে একমাত্র ভরসা, নতুন পথের দিশারী। বিগত সরকার এটাই বুঝতে বা অনুভব করতে চায়নি। সে শিক্ষা-দীক্ষাও তাদের ছিল না। আর সেই কারণেই, শুধু শহরে নয়, গ্রামে-গঞ্জে মানুষের প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রাক-বাজেট বৈঠক এত জরুরি ভিত্তিতে করে চলেছেন, অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত।
দেশের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নের ক্ষেত্রে অতি গুরুত্বপূর্ণ “নীতি আয়োগ”-এ সবিস্তার আলোচনা। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা তার অর্থমন্ত্রী কেন্দ্রীয় স্তরে নীতি আয়োগের বৈঠকগুলিতে গরহাজির থাকতেন। রাজ্যের প্রাক্তন বিজেপি বিধায়ক অশোক লাহিড়ী এই দেশের একজন খ্যাতনামা অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত। দেশের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী প্রবীণ এই অর্থনীতিবিদকেই নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে নিয়োগ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী পদাধিকরণে এই নীতি আয়োজনের চেয়ারম্যান। অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই আয়োগের জরুরি বৈঠক হল দিল্লিতে। চলতি মাসের ১১ জুন এই বৈঠকে ছিলেন অর্থনীতিবিদ এবং নীতি আয়োগের ভাইস চেয়ারম্যান অশোক লাহিড়ীও। বহু বছর পর রাজ্যের সদ্য নির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী নীতি আয়োগের এই বৈঠকে যোগ দিলেন। সেখানে পশ্চিমবঙ্গের কার্যত ভেঙে পড়া আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে। দিল্লিতে অনুষ্ঠিত ১১ জুনের এই বৈঠকে রাজ্যের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পর্যটন এবং উত্তরবঙ্গের সার্বিক উন্নয়নে কী কী করণীয়, সেই প্রসঙ্গে দীর্ঘ আলোচনা হয়েছে বলে “নীতি আয়োগ” সংস্থার সূত্রেই খবর। উত্তরবঙ্গের অঘোষিত রাজধানী শিলিগুড়িকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার বিষয়েও সবিস্তার আলোচনা হয়েছে। এছাড়াও রাজ্যে আরও তিনটি আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস গড়ে তোলার বিষয়েও নীতি আয়োগের ১১ জুনের বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। শিলিগুড়ি-সহ উত্তরবঙ্গে উন্নতমানের চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলার বিষয়েও আলোচনা ও প্রস্তাব গৃহীত হয়েছে বলে নীতি আয়োগ সংস্থা সূত্রেই খবর। রাজ্যকে “ব্যবসা-বান্ধব”-এর সরকার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। নীতি আয়োগের আলোচনা-বৈঠকে উপস্থিত থেকে দৃশ্যতই খুশি শুভেন্দু বাবুর সংক্ষিপ্ত প্রতিক্রিয়া- “রাজ্যের স্বার্থে বড় পদক্ষেপ”। নীতি আয়োগের এই বৈঠকের প্রস্তাবাবলী নিয়েও রাজ্য বাজেটে আলোচনা হবে বলে অর্থ দফতর সূত্রের খবর।