শ্যামল মুখোপাধ্যায়: দুর্গম উঁচু পাহাড়ে ওঠার মতো বিশাল আকারের শক্তিশালী মোটর বাইক। ওই বাইকের আরোহী সুঠাম চেহারার এক মহিলা। তাদের সেই অতিরিক্ত হিমশীতল চাউনি দেখলেই দুষ্কৃতীদের আত্মারাম খাঁচা ছাড়া অবস্থায় পৌঁছে যাবে। কুখ্যাত দুষ্কৃতীদের শিরদাঁড়া দিয়ে হিমশীতল আতঙ্কের স্রোত বয়ে যাবে। মেলার ভিড় থেকে আনাচে-কানাচে দৃপ্তভঙ্গিতে এইসব বড় আকারের মোটরবাইক এবং তার আরোহী প্রমিলা বাহিনী। শহর থেকে গ্রাম, রেল স্টেশন থেকে মেট্রো স্টেশন, রাস্তাঘাট এই প্রমীলা বাহিনীর হাত থেকে নিস্তার নেই মহিলাদের উত্ত্যক্ত করে বেড়ানো বা মহিলাদের উপর করা সেইসব অখ্যাত-কুখ্যাত দুষ্কৃতীদের কারোও। এইসব দুর্ধর্ষ প্রশিক্ষিত প্রমিলা বাহিনী কখনও দল বেঁধে কখনও বা ঘুরবেন পৃথকভাবে। রাজ্যের তৎপর মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর স্বপ্নের এই “দুর্গা বাহিনী” রাজ্যে নারীদের সুরক্ষা সুনিশ্চিত করতেই রাজ্য বিধানসভায় পেশ করা স্বরাষ্ট্র ও পার্বত্য বিষয়ক দফতরের বাজেটে এই শক্তিশালী দুর্গা বাহিনী গঠন স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী তথা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। এদের পোশাকি নাম “দুর্গা সুরক্ষা স্কোয়াড”। এছাড়াও নারীদের সুরক্ষায় রাজ্য রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীতে “মাতঙ্গিনী হাজরা” এবং “রানী শিরোমনির” নামাঙ্কিত সম্পূর্ণভাবে মহিলা পরিচালিত দু”টি ব্যাটালিয়ন গঠন করা হচ্ছে। রাজ্যের প্রতিটি মহকুমায় একটি করে “মহিলা থানা” এবং “নারী সহায়তা ডেস্ক” করা হচ্ছে।
জাতীয় নিরাপত্তা এবং জনকল্যাণমূলক প্রকল্পগুলির সুফল খাতে যোগ্য উপকার ভোগীরাই পান তা সুনিশ্চিত করতে অবৈধ অনুপ্রবেশ প্রতিরোধ করতেই হবে। এ ব্যাপারে কোনও আপোষ নয়। শুভেন্দু বাবুর কথায়, “এই লক্ষ্য পূরণে সরকার কঠোরভাবে- শনাক্তকরণ, নাম বাতিল ও বহিষ্করণের নীতিকাঠামো রূপায়িত করার ক্ষেত্রে দৃঢ় পদক্ষেপ নিচ্ছে।” রাজ্যের নারী সুরক্ষা যে সুনিশ্চিত করা সকলের সমষ্টিগত দায়িত্ব এবং এরজন্য যে কঠোর আইন দরকার সে ব্যাপারে কোনও দ্বিধা রাখতে চান না রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। এই কঠোর আইন তৈরির পাশাপাশি সর্বতোভাবে মহিলাদের নিরাপত্তা দেওয়ার কথা মাথায় রেখেই শুভেন্দু বাবু রাজ্য বিধানসভায় পেশ করা ২০২৬-২৭-এর আর্থিক বছরের জন্য বরাদ্দের প্রসঙ্গ জানাতে গিয়েই এই “দুর্গা বাহিনী” মহাকুমা স্তরেও মহিলা থানা গঠনের প্রসঙ্গ তুলেছেন বারবার। স্বরাষ্ট্র দফতরের বাজেটেই বলা হয়েছে রাজ্য রিজার্ভ পুলিশ বাহিনীতে “মাতঙ্গিনি হাজরা” এবং “রানী শিরোমনির” নামে সম্পূর্ণভাবে মহিলা পরিচালিত দু”টি ব্যাটেলিয়ন গঠনের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। শুভেন্দু বাবুর স্পষ্ট অভিজ্ঞতা, জরুরি পরিস্থিতিতে তৎক্ষণাৎ সমোয়োচিত ব্যবস্থা নিতে পারলে দুর্ঘটনা, অপরাধ, প্রাকৃতিক বিপর্যয় এবং অন্যান্য সংকটের সময় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা যেতে পারে। আর এই প্রয়োজনের কথা মনে রেখেই “ইমারজেন্সি রেসপন্স সাপোর্ট সিস্টেম”(ই আর এস এস) ব্যবস্থাকে আর শক্তিশালী নির্ভরযোগ্য করে গড়ে তুলবে রাজ্য। সেই জন্যই রাজ্যের প্রতিটি থানায় বিশেষভাবে নিয়োজিত একটি জরুরি সহায়তা যান বা “ইমারজেন্সি রেসপন্স ভেহিকেল” বা (ই আর ভি)-র ব্যবস্থা রাখবে সরকার।
রাজ্য সরকার চায় নিরপেক্ষ ফৌজদারি বিচার ব্যবস্থার জন্য “ফরেনসিক সায়েন্স ল্যাবরেটরি”গুলির (এফ এস এল) পরিকাঠামোগত উন্নতি ঘটাতে। আর এইসব ল্যাবরেটরিগুলির আধুনিকীকরণ জরুরি ভিত্তিতে করবে রাজ্য সরকার। একইসঙ্গে রাজ্যের সবকটি পুলিশ জেলা এবং কমিশনারেটে অপরাধ স্থল সরেজমিনে খতিয়ে দেখতে “ভ্রাম্যমান ফরেন্সিক ইউনিট” গঠন করার জন্যই অতিরিক্ত “ভ্রাম্যমান ফরেনসিক ভ্যান” জোগাড় করা হচ্ছে। ফরেন্সিক তদন্ত ব্যবস্থার সামর্থ্য বৃদ্ধি, অমীমাংসিত মামলার সংখ্যা কমিয়ে আনা এবং অপরাধের দ্রুততর ও অধিকতর বিজ্ঞান ভিত্তিক তদন্ত সুনিশ্চিত করতেই খড়গপুর, ব্যারাকপুর, কল্যাণী, মুর্শিদাবাদ, সিঙ্গুর এবং মালদায় একটি নতুন “আঞ্চলিক ফরেনসিক সাইন্স ল্যাবরেটরি” (আর এফ এস এল) স্থাপনেরও পরিকল্পনা হয়েছে।
রাজ্য সরকার মনে করে, জনগণনা হল প্রমাণ নির্ভর প্রশাসনের মূল ভিত্তি। শুভেন্দু বাবুর অভিযোগ, বিগত সরকার ২০২৭-এর জনগণনার কাজটিকে স্থগিত করে রেখেছিল। বিগত সরকারের ইচ্ছাকৃত বিলম্বের ফলে এই রাজ্যের দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা এবং উন্নয়নের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। এই সমস্যার দ্রুত সমাধানের জন্যই আসার প্রথম দিনেই অর্থাৎ ২০২৬ এর ১১ মে জনগণনার কাজ শুরু করার বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি জারি করে। রাজ্যের স্বরাষ্ট্র বাজেটে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, দেশে এই প্রথমবার ২০২৭-এর জনগণনার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়াটি অর্থাৎ তথ্য সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও সমন্বয়ের যাবতীয় কাজ একটি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে পরিচালিত হবে। এই সুবৃহৎ কাজে ১ লক্ষ ৯৭ হাজার জন গণনাকারী এবং ৩২০০০ জনেরও বেশি পরিদর্শককে নিয়োগ করা হয়েছে। তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়ারও কাজ চলছে।
রাজনৈতিক সাংবাদিক হিসেবে এবং রাজ্যের বাইরেও দীর্ঘ বছরগুলিতে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট বলতে পারি, রাজ্য সরকারের স্বরাষ্ট্র দফতরের বাজেটে বিভিন্ন জটিল সব সমস্যা সম্পর্কে রাজ্যবাসীকে সবিস্তারে জানানোর এই ধরনের সৎ প্রচেষ্টা সচরাচর নজরে আসেনি। সব বিষয়ে খোলামেলা আলোচনা, যে কোনো রাজ্যের গণতন্ত্র রক্ষা এবং সুস্বাস্থ্যের পক্ষে অতি প্রয়োজনীয়। রীতিমত দক্ষতার সঙ্গে স্বরাষ্ট্র দফতরের বাজেটে তা প্রতিপন্ন করেছেন এই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
তাঁর পেশ করা স্বরাষ্ট্র দফতরের বাজেটেই শুভেন্দু বাবু জানিয়েছেন, সরকারি প্রশাসনে সম্পূর্ণ স্বচ্ছতা, দায়বদ্ধতা এবং ন্যায় পরায়ণতা বজায় রাখার প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দিয়ে রাজ্যের মন্ত্রী পরিষদ পশ্চিমবঙ্গের পূর্ববর্তী সরকারের আমলে সংগঠিত প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতি এবং মহিলাদের প্রতি অত্যাচারের ঘটনার জন্য দু”টি তদন্ত কমিশন গঠন করেছে। বিচারপতি বিশ্বজিৎ বসু এবং সমাপ্তি চট্টোপাধ্যায়ের সভাপতিত্বে এই কমিশন কাজ করছে। দুই বিচারপতি অবসরপ্রাপ্ত। তাঁদের এই কমিশনে বরিষ্ঠ আইপিএস আধিকারিকেরা রয়েছেন। নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে তাঁরা অপরাধীদের উদ্দেশ্যে তাঁদের অনুসন্ধানের ফলাফল ও সুপারিশ রাজ্য সরকারের কাছে পেশ করবে এই সিদ্ধান্তই হয়েছে।