সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়: “হাম দো, হামারা দো”। এই তালিকায় বড্ড ” ভারি ” ‘বাবা-মা’!! বড় অফিসার বা বিদেশ-বিভুঁই তে থাকা ছেলের মস্ত ফ্ল্যাটেও যখন বৃদ্ধ মা-বাবার “…জায়গা বড়ই কম ..”। অগত্যা তাঁদের ঠিকানা ‘ বৃদ্ধাশ্রম’। একসময় ছোট্ট খোকা ভয় পেয়ে নিশ্চিন্তে আশ্রয় নিত মায়ের কোলে বা বাবার বুকে। আজ অসহায় বৃদ্ধ বাবা-মা সহায় পেতে সেই ‘এস্টাব্লিশ’ খোকার ছোঁয়া খুঁজতে বৃদ্ধাশ্রমের দশ ফুট বাই বারো ফুটের ঘরে হাতড়ে বেড়ান, “…দু’হাত আজও খোঁজে, ভুলে যায় যে একদম… “, তখন মেলে শুধুই শূন্যতা। খোলা জানলার বাইরে একলা আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখের কোণ ভিজিয়ে তখন শুধুই নিস্তব্ধতা, নিঃসঙ্গতা। থমকে যাওয়া সময় মনে করিয়ে দেয় মস্ত অফিসার বা পরবাসী খোকার এখন নিশ্চিন্ত আশ্রয় তার ‘স্ট্যাটাস’ ও “প্রিয়জন”, বাবা-মায়ের পরিচয় এখন “দামহীন”।
কিন্তু কালচক্রে ফের দিনবদল। জীবনের ওঠাপড়া থেকে ব্রাত্য হয়ে পড়া বাবা-মা’র পরিচয় যাদের কাছে স্রেফ ‘নিয়মরক্ষা’ বলে মনে হয় তারাই এখন হন্যে হয়ে নিজের অধিকার বজায় রাখতে ভোটার তালিকায় বাবা-মায়ের নাম খুঁজছেন। বাবা-মায়ের নামের বানান ঠিক করার জন্য মরিয়া হয়েছেন। ভিনদেশ বা ভিনরাজ্য থেকে ফোন, কখনো সিইও দপ্তরে কখনো বা বসতবাড়ি এলাকার কাউন্সিলরের কাছে। ফোনকল বেড়েছে নিউটাউন বা চেতলার বৃদ্ধাশ্রমেও। বিজয়ার শুভেচ্ছা বা প্রতীকী প্রণাম জানাতে বছরে এক-দু’বার ফোন করে যারা কর্তব্য পালন করতেন আজ তারাই ঘনঘন ফোন করে বাবা-মায়ের খোঁজ নিচ্ছেন। তেইশ বছর আগে ভোটদানের খুঁটিনাটি জানতে চাইছেন। আর বাবা-মায়ের পরিচয় আচমকা “দামি” করেছে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর, সৌজন্যে নির্বাচন কমিশন।
তথ্য বলছে সিইও দপ্তরের হেল্প ডেস্কে গত এক সপ্তাহে প্রবাসে অথবা ভিনরাজ্য থেকে বেশ কিছু ফোন এসেছে যারা অনলাইনে এনুমারেশন ফর্ম পূরণের ব্যাপারে খোঁজখবর নিয়েছেন, ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় মা-বাবার নাম খূঁজে পেতে কি করণীয় তা জানতে চেয়েছেন। ফাঁকা বসতবাড়ি বিক্রি করে দেওয়া ছেলেবেলার পাড়ায় বিএলও ফর্ম দেবেন না বৃদ্ধাশ্রমে গিয়ে মা-বাবাকে ফর্ম দেবেন এধরনের নানা তথ্য-তালাশ করছেন। খাস কলকাতা বা শহরতলি শুধু নয়, এব্যাপারে মফস্বলের পরিবারের সদস্যরাও রয়েছেন। সিইও দপ্তর জানিয়েছে, ২০০২ সালের তালিকায় বাবা-মায়ের নামের সঙ্গে যে ঠিকানা উল্লেখ করা রয়েছে সেই ঠিকানাতেই এনুমারেশন ফর্ম নিয়ে যাবেন বিএলও-রা। সেখানে বৃদ্ধাশ্রমের ঠিকানা দেওয়া থাকলে তাদের বাবা-মায়েরা সেখানেই এনুমারেশন ফর্ম পাবেন। অথবা বৃদ্ধাশ্রম কর্তৃপক্ষ যদি কোনও ব্যবস্থা নেন তাহলে তাঁরা ফর্ম পেতে পারেন। তবে এসআইআর পর্বে ভোটার তালিকার তথ্যে কোনও সংশোধন করা যাবে না। তেইশ বছর আগে ভোটার তালিকায় নামের যা বানান ছিল ৯ ডিসেম্বরের খসড়া ভোটার তালিকায় সেই বানানেই বাবা-মা বা ঠাকুর্দা-দাদু অথবা নিজের বা পরিজনের নাম উল্লেখ থাকবে। খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর একমাস ধরে সংযোজন-বিয়োজনের জন্য আবেদন করা যেতে পারে। তবে শুধুমাত্র খসড়া ভোটার তালিকায় যাদের নাম থাকবে তাদের ক্ষেত্রেই এই আবেদন গ্রাহ্য হবে। অবশ্য, ফর্ম ৬ পুরণ করে নতুনভাবে ভোটার তালিকায় নাম তোলার সুযোগও থাকবে।
শহরের একাধিক বৃদ্ধাশ্রমে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, গত এক সপ্তাহে আবাসিকদের মধ্যে কিছুটা হলেও তৎপরতা বেড়েছে। কারণ তাঁদের “এস্টাব্লিশ” খোকাদের ফোন এসেছে একাধিকবার। আদরের দাদুভাই-দিদিভাইদের সঙ্গে জমিয়ে গপ্প হয়েছে। কারও ছেলে আবার বাবার ও ঠাকুর্দার নামের বানানটাও ভালো করে জেনে নিয়েছে। নাড়ির টান বা রক্তের সম্পর্ক যখন বিচলিত হয় তখন কি আর ‘পুরানো কাসুন্দি’র ঝাঁঝ থাকে? তাই তো দুচোখ বেয়ে ঝরেছে ওই বৃদ্ধ আবাসিকদের আনন্দাশ্রু। বুড়ো বয়সের ঠিকানা থেকে আধবোজা গলায় বৃদ্ধ দম্পতির মন্তব্য (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক), “আমরা তো জীবন থেকে আগেই হারিয়ে গিয়েছি, আমাদের ভোটের আর কি মুল্য? কিন্তু ওদের ভোটটা যেন ওরা দিতে পারে সেটাই চাই। ছেলে-বৌমারা বাইরে থাকে, ওদের অনেক কাজের চাপ। তাও ওরা চেষ্টা করছে। হয়তো দাদুভাই-দিদিভাইকে নিয়ে ভোটের সময় আসতে পারে। অনেকদিন ওদের দেখিনি”। সত্যিই কি এসআইআরের সৌজন্যে এই প্রতীক্ষার অবসান হবে? কমিশনের এক পদস্থ কর্তার মতে,” বলা মুশকিল। ভোট ব্যবস্থা যেভাবে উন্নত প্রযুক্তি নির্ভর হয়েছে তাতে প্রচুর অর্থব্যয়ে সশরীরে এসে ফর্মপুরণ বা ভোটদানে পরবাসীরা কতটা আগ্রহী হবেন তা নিয়ে ধন্দ থেকেই যায়।” হয়তো এটাই বাস্তব!
বৃদ্ধাবাসের কেয়ারটেকার কথায় ” ওঁদের এই পথ চাওয়াতেই আনন্দ।” তাই আজও নচিকেতার ‘”বৃদ্ধাশ্রম” বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে যায়।অধিকার পেতে ‘ দামি ‘ হলেন ব্রাত্য বাবা-মা, সৌজন্যে এসআইআর