সুন্দরবনের গোসাবা ব্লকের রাঙাবেলিয়ায় জলমগ্ন বীজতলা
Share it

রুণা খামারু: টানা বৃষ্টিতে রাজ্যের বহু জায়গায় ধানের বীজতলা জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। তাই এখন দ্বিতীয়বার ধানের বীজতলা তৈরির প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে চাষিদের। অর্থাৎ আবার ধানের বীজ কিনে নতুন করে বীজতলা তৈরি করে বীজ ফেলতে হবে। এতে একদিকে যেমন চাষিদের শ্রম দিতে হচ্ছে বেশি, চাষের খরচও বাড়ছে তেমনই ধান বোনার কাজেও দেরি হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। আর দেরি হওয়ার অর্থ ফসলের উৎপাদন কমে যাওয়া। সেক্ষেত্রে এবছর খারিফ মরশুমে ধানের ফলন তথা উৎপাদন কেমন হবে তা নিয়ে প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক। ফলন যাতে ঠিক থাকে তাই বর্তমান জলমগ্ন পরিস্থিতিতে কৃষকদের সমাধানের পথ বাতলে দিতে কোথাও কোথাও উদ্যোগী হতে দেখা গেছে শস্য বিশেষজ্ঞদের।

সুন্দরবনের লাক্সবাগান এলাকায় জলমগ্ন বীজতলা

যেমন, দক্ষিণ ২৪ পরগনার গোসাবা ব্লকে মাঠের পর মাঠ এখন প্লাবিত। স্থানীয় বাসিন্দাদের কথায়, ১৫ দিনের টানা বৃষ্টিতে সেখানকার ধানের বীজতলা চার ফুট জলের নীচে চলে গেছে। সুন্দরবনের বেশিরভাগ জমিই এক ফসলী। আইলার মতো প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের কারণে এখানে নোনা জলের প্রাদুর্ভাবই চাষের কাজে বড় বাধা। আর চাষের কাজের জন্য জলের সুবন্দোবস্ত না থাকায় রবি মরশুমে এখানে ধান চাষ সেভাবে হয় না। তাই বর্ষার ধান চাষই এখানকার প্রধান ফসল। এই অবস্থায় এবার অতি বৃষ্টির কারণে সময় মতো ধান চাষ না করা গেলে আর্থিক সংকটের মধ্যে দিয়ে যেতে হবে স্থানীয় চাষিদের। যে কারণে সুন্দরবন অঞ্চলের বাসিন্দাদের মধ্যে রুটিরুজির টানে মাইগ্রেটেড হওয়ার প্রবণতা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে। দক্ষিণ ২৪ পরগনার সুন্দরবন এলাকায় বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ও রামকৃষ্ণ মিশন বিবেকানন্দ রিসার্চ ইনস্টিটিউটের তরফে পরীক্ষামূলকভাবে ধান চাষ করা হয়। এই দুই প্রতিষ্ঠানের অধীনে কৃষিকাজে গবেষণাভিত্তিক প্রকল্পের আওতায় যেসব চাষি সেখানে ধান চাষ করছেন তাঁদের পুনরায় বীজধান দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। নয়টি দ্বীপ নিয়ে গঠিত গোসাবা ব্লকে মোট গ্রাম পঞ্চায়েতের সংখ্যা ১৪। তার মধ্যে রাঙাবেলিয়া, সাতজেলিয়া, লাহিড়িপুর, ছোটো মল্লাখালি গ্রাম পঞ্চায়েতের ওইসব প্রতিষ্ঠানের প্রকল্পের অধীন প্রায় ৩০০ চাষিকে ১৭ জুলাই থেকে নতুন করে ধানের বীজ দেওয়া হবে বলে জানা গেছে।

ধান বীজ দেওয়ার আগে কৃষকদের একটি মুহূর্ত

বর্ষার ধান রোয়ার কাজ শেষ হয়ে যায় ১৫ আগস্টের মধ্যে। সেক্ষেত্রে দ্বিতীয়বার ধান রোয়ার পর বীজতলা তৈরি হলেও ফের যদি অতি বৃষ্টির কারণে তা নষ্ট হয়ে যায়, তাহলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আর জমিতে ধান রোয়া সম্ভব হবে না। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, জমিতে ধান বোনার কাজ নির্দিষ্ট কাট অফ ডে-র পরে হলে চিটে ধানের সমস্যা দেখা দেয়। ফলে ভালো ধানের ফলন কমে যায়। তবে এবছর বর্ষার ধানের ফলন কেমন হবে তা এখনই বলে দেওয়া সম্ভব নয় বলে মনে করেন রাজ্যের প্রাক্তন কৃষি আধিকারিক তথা ধান বিশেষজ্ঞ শ্রী অনুপম পাল। তাঁর মতে, “ধান বোনার জন্য এখনও এক মাস সময় আছে। সুন্দরবন অঞ্চলের কৃষকরা এই জল সমস্যার সঙ্গে অভ্যস্ত। অবস্থা অনুযায়ী কৃষকরা ব্যবস্থা নেবেন। এখনই সব খারাপ বলা যাবে না। দেশি ধানের গাছ বেশি টেকসই তাই যাঁরা দেশি ধানের চাষ করেন তাঁদের সমস্যা কম হবে।”

জলমগ্ন বীজতলা

তাহলে রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলের ক্ষরাপ্রবণ জেলাগুলিতে কি এবারে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ বেশি হওয়ায় ধানের চাষ ভালো হবে? এ প্রশ্নের উত্তর অবশ্য কৃষি বিশেষজ্ঞরা এক কথায় দিতে নারাজ। ধান বিশেষজ্ঞ শ্রী অনুপম পালের কথায়, “ক্ষরাপ্রবণ এলাকায় বৃষ্টি বেশি হলেই ধান ভালো হবে বিষয়টা এমন নয়। অপরিষ্কার জলে ধান চাষ ভালো হয় না। তার জন্য প্রয়োজন পরিষ্কার জল। তাতে জল জমে থাকলেও সহনশীল ভ্যারাইটি অনুযায়ী গাছের তেমন ক্ষতি হয় না।” এনিয়ে চুঁচুঁড়া ধান্য গবেষণা কেন্দ্রের এক কৃষি বিজ্ঞানী বলেন, “দক্ষিণবঙ্গের অন্যান্য জেলার মতো ক্ষরাপ্রবণ জেলাগুলিতেও বছরে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ থাকে ১২০০ থেকে ১৪০০ মিলিলিটার। তাহলে ক্ষরাপ্রবণ হচ্ছে কী করে ! আসলে ফসলের উপযুক্ত উৎপাদনের জন্য সময়মতো বৃষ্টিপাত হচ্ছে কিনা সেটাই মূল বিষয়। ওইসব জেলাগুলিতে অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে সমস্যা দেখা দেয়। যেমন, ধানের ফুল যখন আসে তখন বৃষ্টি বেশি হলে ফুল ঝরে গিয়ে ফলনে ব্যাঘাত ঘটে। অর্থাৎ অসময়ের বৃষ্টি, যখন বৃষ্টির প্রয়োজন নেই তখন বৃষ্টি হলে ফসলের সমস্যা। আবার পাহাড়ি এলাকায় একটু বেশি বা টানা বৃষ্টি হলে ঢাল বেয়ে সব জলই জমিতে নেমে আসে তখন ফসল জলে ডুবে যায়। অর্থাৎ ক্ষরাপ্রবণ জেলা মানে বছরে গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ কম বা এই কারণে কৃষিকাজের ব্যাঘাত হচ্ছে এমনটাও নয়। আসল কথা হল বৃষ্টিপাতের সুষম বণ্টন না হলে সেটা সমস্যার অর্থাৎ নিয়মিত ও সঠিক পরিমাণে বৃষ্টি হলে তবেই তা ফসলের উৎপাদনের জন্য ভালো।”

সবশেষে কৃষকদের আরও সতর্ক হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চুঁচুঁড়া ধান্য গবেষণা কেন্দ্রের ওই বর্ষীয়ান কৃষি বিজ্ঞানী। তাঁর কথায়, এখন আবহাওয়া বিজ্ঞানের অনেক উন্নতি হয়েছে। এবছর অতি বৃষ্টির পূর্বাভাসও ছিল। কিন্তু চাষ চলে সেই গতানুগতিক। প্রতি বছর যে সময়ে বীজ ফেলা হয় সেরকমই এবারেও জুন মাসের মাঝামাঝি বীজতলা তৈরি করেছেন কৃষকরা। আষাঢ়ের প্রবল বৃষ্টিতে অনেক জায়গাতেই তা এখন ক্ষতিগ্রস্ত। তাই ফের বীজতলা তৈরি করতে হচ্ছে। সেজন্য অযথা শ্রম দিবস ও অর্থ নষ্ট না করে প্রয়োজনে আবহাওয়ার পূর্বাভাস মেনে কৃষকদের একটু বুঝে শুনে চাষ করার পরামর্শ দিচ্ছেন তিনি।

Share it