শ্যামল মুখোপাধ্যায়: উন্নয়নের এই প্রবল জোয়ার রোধিবে কে? রাজ্যের অর্থমন্ত্রী সপন দাশগুপ্তের এবারের বাজেট পেশ করার কয়েক দিন আগেই এই মিডিয়ায় স্পষ্ট জানানো হয়েছিল, উন্নয়নই হবে ২০২৬-২৭ অর্থবর্ষের পূর্ণাঙ্গ বাজেটের প্রথম, দ্বিতীয় এবং শেষ দিশা। (উন্নয়ন, উন্নয়ন এবং উন্নয়ন। এবারের রাজ্য বাজেটের অভিমুখ ও গতিমুখ এই একটাই। এই খবর ১৫ জুন ২০২৬ প্রচার করা হয়েছিল)। কার্যত হলও তাই। আসলে, বিজেপি দলের সর্বভারতীয় নেতৃত্ব বিধানসভার নির্বাচনী প্রচারে এই রাজ্যে এসে বারবার বলে গিয়েছেন, ক্ষমতায় এলে তারা উন্নয়নের জোয়ার বইয়ে দেবেন। দেশের প্রধানমন্ত্রী, কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর তাদের ভাষণে উন্নয়নের প্রতিশ্রুতিরই দিয়েছেন বারবার।
সোমবার ২২ জুন রাজ্য বিধানসভায় প্রায় দেড় ঘন্টার ভাষণে রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত দ্বিধাহীন কণ্ঠে যে ৪ লক্ষ ৩৮ হাজার ৭৭৫.২৯ কোটি টাকার পূর্ণাঙ্গ বাজেট পেশ করলেন, তার ছত্রে ছত্রে ছিল উন্নয়নের পথে সঠিক দিকনির্দেশ। পরিকাঠামো উন্নয়ন, বেকারদের কর্মসংস্থান, বিভিন্ন ক্ষেত্রে কর্মরতদের ভাতা বৃদ্ধি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নানা ক্ষেত্রে কার্যত স্তব্ধ হয়ে যাওয়া প্রকল্পগুলিতে নতুন করে প্রাণ সঞ্চারের হিসেবের কথা জানিয়ে সেই মতো রাজ্য বাজেটে ব্যয় বরাদ্দ করা হয়েছে। রাজনৈতিক সাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘ বছর রাজ্য বিধানসভার অধিবেশনগুলি, বিশেষ করে বাজেট অধিবেশন কভার করার অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট জানাতে পারি, এই বাজেট বিবৃতিতে সামান্যতম ফাঁক-ফোকরও রাখা হয়নি। “কুকুরের মতো ঘেউ ঘেউ করতে হয়নি (প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর কটূক্তি)-তাঁর কথা রাখলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
এই বাজেটে বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর বারবার ঘোষণা মতোই অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত মুখ্যমন্ত্রীর সেই ঘোষণাকে পূর্ণ মর্যাদা দিয়েই রাজ্য সরকারি কর্মীদের প্রাপ্য ডিএ ঘোষণা করে দিলেন। বাজেটে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দেওয়া হয়েছে, ডিএ ২০ শতাংশ বাড়িয়ে দেওয়া হল। অর্থাৎ দাঁড়াল ৩৮ শতাংশ বৃদ্ধি। রাজ্য সরকারি কর্মচারী সংগঠনের এক প্রথম সারির নেতা এই রাজনৈতিক সংবাদদাতাকে বলেছেন, “ভেবেছিলাম অন্য সব রাজনৈতিক নেতাদের মতো শুভেন্দু বাবুও ডিএ নিয়ে ফাঁকা প্রতিশ্রুতি দিয়ে মাঠে ময়দানে বক্তৃতা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। আমাদের সেইসব ভ্রান্ত ধারণাকে ভুল-মহা ভুল-সবই ভুল প্রতিপন্ন করে দিলেন শুভেন্দু বাবু। তার সরকারের প্রথম বাজেটেই প্রতিশ্রুতি রক্ষার স্পষ্ট উদাহরণ পেলাম।” এবার বিরোধীরা কি বলবেন? না, রাজ্য কো-অর্ডিনেশন কমিটিও এ বিষয়ে এখনই স্পষ্ট কোনও বিরোধিতা করতে পারছে না। তাদের সংগঠনের এক বামপন্থী নেতা আমাদের শুধুমাত্র জানিয়েছেন, “আমরা পরিস্থিতির দিকে সতর্কভাবে লক্ষ্য রাখছি।” তবে এই বাজেটের কোনও সমালোচনা তারা এখনও করেননি।
বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের বিষয়েও বড় ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রাজ্য বাজেটে স্পষ্ট ভাষায় আপাতত এক লক্ষ শূন্যপদে অবিলম্বে নিয়োগের কথা বলা হয়েছে। এর মধ্যে মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে; ৩৩ শতাংশ পদ। কলেজগুলিতে দীর্ঘ বছর কোনও নিয়োগের কথা ভাবেইনি আগের সরকার। বর্তমান অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত তাঁর বাজেট বক্তৃতায় বলেছেন, “কলেজগুলিতে অধ্যাপক, শিক্ষক নিয়োগের জন্য ৫০ হাজার পদ সৃষ্টি করা হয়েছে। একই সঙ্গে হাজারো নিন্দামন্দ, সমালোচনা, কটুক্তি, শাস্তির বিধান দেওয়া হলেও পুলিশের প্রতি সব সরকারকেই বরাবরই পুরোপুরি নির্ভর করতে হয়। এটাই কঠিন, কঠোর এবং নির্মম বাস্তব। কিন্তু এই রাজ্যে সেই পুলিশবাহিনীরই, যে কি করুণ হাল, তা ওয়াকিবহাল ব্যক্তি ছাড়া বাইরে থেকে কারোর পক্ষেই অনুধাবন করা সম্ভব না। ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, সব নিধিরাম সর্দার। এই রাজ্যের বহু অভিজ্ঞতার সাক্ষী থাকার বিষয়ে বলতে গিয়েই ফের একবার বলতে বা লিখতে বাধ্য হচ্ছি, শুধু দোষারোপ করে বা তীব্র কটূক্তি জানিয়ে শাস্তির বিধান দিয়েই দায়মুক্ত হলে চলবে না। এই কঠিন সত্যটি বর্তমান বিজেপি সরকারের মুখ্যমন্ত্রী, পোড়খাওয়া নেতা, শুভেন্দু অধিকারীর নজর এড়ায়নি। পুলিশে অবিলম্বে ২০ হাজার নিয়োগের জন্য রাজ্য বাজেটে বরাদ্দও রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে পুলিশের একদল নিচুতলার কর্মীবাহিনী, সিভিক ভলেন্টিয়ার, গ্রিন পুলিশের পারিশ্রমিক ২০০০ টাকা বৃদ্ধি করা হল বাজেটে। শুধু পুলিশবাহিনী নয়, গ্রামগঞ্জে বাড়ি বাড়িতে গিয়ে তাদের স্বাস্থ্যের খবরাখবর নেওয়া থেকে শুরু করে যেসব একজন নিচুতলার কর্মী, আশা কর্মী এবং অঙ্গনওয়াড়ি কর্মীরা দিবারাত্রি পরিশ্রম করছেন, তাদেরও এক ধাক্কায় ৫০০০ টাকা বেতন বৃদ্ধি করে দিল এই সরকার।
মহিলাদের উন্নয়নের প্রতি এই সরকারের যে নজরদারি রয়েছে তুঙ্গে, তা প্রতিফলিত হয়েছে অর্থমন্ত্রীর পেশ করা বাজেটে। আর সেই কারণেই রাজ্যের নারী এবং শিশু উন্নয়ন এবং সমাজকল্যাণ দফতর পেয়েছে ৫২ হাজার ৩০৮ কোটি টাকার বরাদ্দ। এর মধ্যে অন্নপূর্ণা যোজনার জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৬ হাজার কোটি টাকা। এই বিপুল পরিমাণ বরাদ্দে মহিলাদের প্রতি মাসে ৩০০০ টাকা করে দেওয়া হবে। নারীদের আর্থিক স্বনির্ভরতার পক্ষে, এই যোজনা একটি শক্তিশালী পদক্ষেপ। গ্রামের আর্থ-সামাজিক ভিত্তিকে আরও মজবুতভাবে প্রতিষ্ঠিত করার লক্ষ্যে, পঞ্চায়েত এবং গ্রামোন্নয়ন দফতরকে দেওয়া হয়েছে ৫১ হাজার ৮৩৬ কোটি টাকা। রাজ্যের অর্থমন্ত্রী, শিক্ষার বিষয়টিতে অত্যন্ত বেশি মাত্রায় নজরদারি রাখতে চান। তাঁর কথায়, “শিক্ষার উন্নয়ন না ঘটলে, একটা জাতির মেরুদণ্ড শক্ত হতে পারে না।” আর এই ভাবনাকে মাথায় রেখেই স্কুল শিক্ষা দফতরের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৪৪ হাজার ৯৪৮.২১ কোটি টাকা। অর্থমন্ত্রী স্পষ্ট বক্তব্য, “গ্রামীন পরিকাঠামো উন্নয়ন এবং শিক্ষা ব্যবস্থার পুনর্গঠনের ক্ষেত্রে এই বরাদ্দ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে।” শিক্ষাক্ষেত্রে আরও অনেক উল্লেখ্যযোগ্য ঘোষণা রয়েছে রাজ্য বাজেটে। উত্তরবঙ্গ এবার বিজেপির পক্ষে ঢেলে সমর্থন জানিয়েছে। তাই বাজেটে উত্তরবঙ্গকে সর্বক্ষেত্রে সর্বান্তকরণে পুষিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা করেছে রাজ্য সরকার। উত্তরবঙ্গে একটি আইআইটি, একটি আইআইএম এবং একটি এআইআইএমএম প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
শিল্পের প্রয়োজনে রাজ্যজুড়ে পরিকাঠামো উন্নয়নেও ব্যাপক জোর দেওয়া হয়েছে। কল্যাণীতে “গ্রিনফিল্ড বিমানবন্দর” তৈরি, পুরুলিয়া, মালদহ, বালুরঘাট এলাকায় নতুন বিমানবন্দর তৈরির পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে। চিংড়িঘাটা-নিউ টাউন এলিভেটেড করিডোরের জন্য ১০০ কোটি টাকা এবং সুন্দরবন এলাকার যোগাযোগের জন্য আরও ১০০ কোটি টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে বাজেটে। ঘাটাল মাস্টার প্ল্যানের জন্য ১২০০ কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। পরিকাঠামো উন্নয়ন করতেই হবে শিল্পায়নের স্বার্থে। পরিকাঠামো উন্নয়নের ব্যাপারে রাজ্যের নির্দিষ্ট সব প্রস্তাব, ভাবনা-চিন্তা এবং আর্থিক ব্যয় বরাদ্দ নিয়ে পরবর্তী সংখ্যায় পৃথকভাবে দীর্ঘ প্রতিবেদন করার সুযোগ রয়েছে, সেটাই করা হবে। অবশেষে একটি কথা, উন্নয়নের গতিমুখ সুনির্দিষ্ট দিশা স্পষ্ট করা হয়েছে। এবার এগিয়ে চলা দৃঢ় গতিতে। রাজ্য সরকার সেই লক্ষ্যেই এগোচ্ছে।