Share it

শ্যামল মুখোপাধ্যায়: শুধু সারা দেশেই নয়, এই রাজ্যেও কংগ্রেসের এখন অগ্নিপরীক্ষা। বিশাল এই দেশে এখনও হাতেগোনা কয়েকটি রাজ্যে কংগ্রেস ক্ষমতায়। বাকি ২২টি রাজ্যে বিজেপির নেতৃত্বে এনডিএ ক্ষমতায়। বাকি উত্তরে জম্মু-কাশ্মীর, হিমাচল প্রদেশ, পঞ্জাব, দক্ষিণের কেরলাম, কর্নাটক, তামিলনাড়ু বাদে বাকি সব জায়গায় কার্যত গেরুয়ারাই। এই মুহূর্তে সারা দেশের রাজনৈতিক দলগুলির ভোটের হারের শতাংশের হিসেব কষে দেখা যাচ্ছে, এই দুর্দিনেও কংগ্রেসের ভোটের সব মিলিয়ে শতাংশের হার এখনও যথেষ্টই আছে। বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ জোটের ভোটের শতাংশের হার থেকে পিছিয়ে থাকলেও তা তলানিতে পৌঁছে গিয়েছে, এখনও সেটার বলার সময় আসেনি। কংগ্রেস ‘হাইকমান্ডের’ সামনে এখন একটাই পরীক্ষা ফের তারা বিরোধী জোট গড়ে ঘুরে দাঁড়ানোর মতো শক্তি সঞ্চয় করতে পারবে কি-না?

কিন্তু পশ্চিমবঙ্গে কি অবস্থা? অবস্থা খারাপ থেকে আরও খারাপ হয়ে গিয়েছে। এই রাজ্যে কংগ্রেস কি আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে কোনোদিনও? রাজনীতি হচ্ছে সম্ভাবনার শিল্প। হতে পারে আবার নাও হতে পারে। সিপিএমের কথা বলে আর লাভ নেই। ভোটের শতকরা হিসেব বিশ্লেষণ করে এটা স্পষ্ট লিখে দেওয়া যায় যে, এই ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে ‘বামের ভোট রামে’ গিয়েছে। তাই সিপিএমের ৫.৩ শতাংশ ভোট। কেন এমন হল, তা নিয়ে এই পত্রিকার পাঠকদের আগেও জানিয়েছি। আবারও লিখব। গত সংখ্যায় বলেছিলাম, এই রাজ্যে কংগ্রেসের সর্বশেষ হাল-হকিকৎ নিয়ে আলোচনা করব। আপাতত তাই করছি।

স্বাধীনতার পর থেকে ১৯৬৭ সাল পর্যন্ত এই দেশে এবং এই রাজ্যে জাতীয় কংগ্রেসের ছিল রমরমা। ১৯৬৭ সালের পর থেকে ১৯৭১ পর্যন্ত পশ্চিমবঙ্গ নামক এই রাজ্যটিতে শুধু রাজনৈতিক ক্ষেত্রেই নয়, শিক্ষা, শিল্প, সামাজিক-বিভিন্ন ক্ষেত্রগুলিতে চরম নৈরাজ্যের পরিবেশ ছিল। এই সময়ে চারু মজুমদারের নেতৃত্বে নকশালবাড়ি আন্দোলন, খতমের রাজনীতি, নকশালদের নামে এক শ্রেণির ‘লুম্পেনদের’ ভয়ঙ্কর দাপাদাপিতে এবং আগ্নেয়াস্ত্রের ঝনঝনানিতে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছিল এই বাংলা। পরে এই রাজ্যের নকশালবাড়ি আন্দোলন মাওবাদী গেরিলা সংগঠনের নামে দেশের বিভিন্ন এলাকায় ভয়ানক ত্রাসের সৃষ্টি করে। আপাতত তা অনেকটাই স্তিমিত। কেন এই অবস্থা, তার ব্যাখ্যা পরবর্তী কোনও সংখ্যায় দেওয়া যাবে। ১৯৬৭ সালের সেই দিনগুলি থেকেই প্রবল প্রতাপান্বিত কংগ্রেস দল এই রাজ্যে গুটিয়ে যেতে বসেছে।

নকশালদের ভয়ে কংগ্রেসের রথী-মহারথী নেতারা রাজ্য ছেড়ে পালিয়ে গেলেন অনেকেই। নেতাদের এই পলায়ন দেখে নিজেদের বাঁচাতে নিচুতলার কংগ্রেস কর্মীদের গ্রামগঞ্জের বেশিরভাগ অংশে ভিড়ে গেলেন নকশালদের সঙ্গে। এই রাজ্যের শক্ত জমি হারিয়ে ফেলল কংগ্রেস। পাঁচ বছর ধরে চলল অশান্তি। রাজ্যে কংগ্রেস ফের ফিরে এল ১৯৭২ সালে। তখন তিনি কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী। ব্যারিস্টার সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জনের নাতি। তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, তাঁর অতি প্রিয় সিদ্ধার্থশঙ্করকে পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বে পাঠালেন। কঠোর হাতে নকশাল (মাওবাদী) নামের সেইসব লুম্পেনদের বিরুদ্ধে পুলিশকর্তা রুনু গুহ নিয়োগী এবং তাঁর বাহিনীকে ফিল্ডে নামিয়ে দিলেন। সে এক ভয়ানক লড়াই। জব্দ হল নকশাল আন্দোলনের নামে খুনোখুনি। এর পরেই এলো বিধানসভার নির্বাচন। সিদ্ধার্থবাবুর নেতৃত্বে কংগ্রেস বসল রাজ্যের মসনদে। তাঁদের বিরুদ্ধে সিপিএম জিতেছিল মাত্র ১৪টি আসনে। ‘ভোটে ব্যাপক রিগিং হয়েছে’- এই অভিযোগ তুলে ১৯৭২ থেকে ৭৭ সাল পর্যন্ত রাজ্য বিধানসভা বয়কট করে সিপিএম সহ বামেরা। ফাঁকা ময়দান। কংগ্রেসের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব বাড়তেই থাকল। মন্ত্রী-বিধায়ক, ক্ষমতাহীন পদাধিকারীদের দুর্নীতিতে জেরবার সিদ্ধার্থশঙ্কর রায় তদন্ত কমিশন গঠন করলেন। মুখ্যমন্ত্রী সিদ্ধার্থবাবুর গড়ে দেওয়া সেই ‘ওয়াং চু কমিশন’-এর রিপোর্ট কী হল? তা প্রকাশ্যে এল না। এই নিয়েই কংগ্রেস নেতাদের মধ্যে তিক্ততার চূড়ান্ত আকার ধারণ করল। দুর্নীতি, গোষ্ঠীকোন্দল, নিজেদের মধ্যেই খুনোখুনি – এইসব নিয়েই রীতিমতো ডামাডোলে কাটিয়ে দিল কংগ্রেস প্রশাসন। সেই সুযোগ পূর্ণমাত্রায় ব্যবহার করে, ১৯৭৭ সালে ক্ষমতায় চলে এল জ্যোতি বসুর নেতৃত্বে সিপিএম তথা বামফ্রন্ট।

সেই সময় থেকেই কংগ্রেসের মতো দেশের একটা প্রবল শক্তিধর বিশাল সংগঠন এই রাজ্যে দ্রুত দুর্বল থেকে দুর্বলতর হতে থাকল। পরে কংগ্রেস ছেড়ে বেরিয়ে, তৎকালীন যুবনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূল কংগ্রেস গঠন করলেন। এই হল রাজ্যের রাজনৈতিক পরিমণ্ডলের অতি সংক্ষিপ্ত ইতিহাস। মমতার নেতৃত্বে ২০১১ সালে তৃণমূল কংগ্রেস রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর, ৩৪ বছর রাজ্য শাসন করার পরেও সিপিএম সহ বামেদের হাল যেমন দ্রুত খারাপ হয়েছে। আরও খারাপ হয়েছে কংগ্রেস দলের সংগঠনের অবস্থার। এর আগের সংখ্যায় এই কাগজেই সিপিএম সহ বামেদের হাল এত খারাপ হয়ে গেল কেন, তা নিয়ে সংক্ষিপ্ত আকারে নানারকম তথ্য ও বিশ্লেষণ দিয়ে পাঠকদের সব জানিয়েছি। এবার লিখছি কংগ্রেসকে নিয়ে।

তৎকালীন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরীর প্রবল আগ্রহে সিপিএম সহ বামফ্রন্টের সঙ্গে জোট বেঁধে নির্বাচনী লড়াইয়ে নামল দল। ২০১১ সালে কংগ্রেসের জোট ছিল তৃণমূল কংগ্রেসের সঙ্গে। সেই জোট ভেঙে যাওয়ার পরেও ২০১৬ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস এবং বাম জোট ও আইএসএফ দল কিছু আসনে জিতেছিল। এরপর থেকেই কংগ্রেস, সিপিএম এবং বামেদের পতন চূড়ান্ত রূপ নিল। লোকসভা, বিধানসভার নির্বাচনে আসন সংখ্যা শূন্য। এবার এই ২০২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে কংগ্রেস দুটি আসনে জিতলেও ভোটের শতকরা হার দূরবীণ দিয়ে দেখতে হচ্ছে। মাত্র ৩.৪% ভোট এসেছে কংগ্রেসের ঝুলিতে। ভবিষ্যৎ কী? প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার নিজেও হেরেছেন। বহরমপুর থেকে হেরেছেন জাঁদরেল নেতা অধীর চৌধুরী। এর পরেও আশাবাদী প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি। এই রাজনৈতিক সংবাদদাতাকে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এখনও বলেছেন, ভবিষ্যৎ যতটা খারাপ দেখানো হচ্ছে, ততটা খারাপ নয়। এখনও ঘুরে দাঁড়ানোর যথেষ্ট সুযোগ আছে।- ‘ধন্য আশা কুহকিনী’।

Share it