শ্যামল মুখোপাধ্যায়: মুখ্যমন্ত্রীর চেয়ারে বসেই রীতিমতো “ঝোড়ো ব্যাটিং” করছেন শুভেন্দু অধিকারী। বাংলায় একটা প্রবাদ লোকে মুখে মুখে ঘোরে- “পয়লা রাতেই বেড়াল মারো”। বিজেপি মুখ্যমন্ত্রী সম্ভবত সেই প্রবাদটি মনে রেখেই “পয়লা রাতেই বেড়াল মারতে” সর্বস্তরের মানুষ দলমত নির্বিশেষে সবাইকে নিয়ে একযোগে ঝাঁপিয়ে পড়েছেন। এই ব্যাপারে সদ্যগঠিত মন্ত্রিসভা এবং সর্বোপরি দিল্লির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব সর্বান্তকরণে পরিপূর্ণ সমর্থন জানিয়ে যাচ্ছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে। রাজনৈতিক সাংবাদিক হিসেবে দীর্ঘ বছর এই রাজ্যে এবং বাইরেও খবর করার অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট লিখে দিতে পারি, এই রাজ্যে ক্ষমতার বসার সঙ্গে সঙ্গেই বর্তমান সময়ের মতো প্রথম দিন থেকেই “ঝোড়ো ব্যাটিং” চালাতে কাউকে দেখিনি।
১৯৭৭ সালে বামফ্রন্ট সরকারের মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসু বা ২০১১ সালে মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানের পর প্রায় মাসখানেক ধরে চলে বিভিন্ন গণসংগঠনের পক্ষ থেকে “গণ সম্বর্ধনা” অনুষ্ঠান। সেই সময়টায় কাজকর্ম যে সেই রকমভাবে হয়নি, তা সামনে থেকে চাক্ষুষ করেছি। আর এখন কলকাতা সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তের আমজনতার দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, নিউ মার্কেট, পার্ক সার্কাস-সহ বিভিন্ন এলাকা সব বেদখল হয়ে গিয়েছে। মেটিয়াবুরুজ থেকে শুরু করে রাজাবাজার এলাকার কোনও রাস্তা দিয়েই কার্যত চলাফেরা করা যায় না। ঘন্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকে বিভিন্ন ধরনের গাড়ি। সব বেআইনি দখলদারি। এখানে প্রশাসন বলে কিছু ছিল না। কর্তারাও রীতিমতো ভয় পেতেন – তা আমাদের কাছে অনেকে স্বীকারও করতেন। বর্তমান সরকারের একটাই দৃঢ় পদক্ষেপ – মানুষকে এইভাবে বছরের পর বছর হয়রানির মুখে ফেলে দেওয়ার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে এবং এখন নিচ্ছেও। এইভাবে “বুলডোজার নীতি” প্রয়োগ করার ফলে যেসব ফুটপাথ ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন বলে কান্নাকাটি করছেন, তাদের পুনর্বাসনের ব্যাপারেও যে শুভেন্দু বাবুর সরকার ভাবনা চিন্তা করছেন, তার ইঙ্গিতও মিলেছে ইতিমধ্যেই। তবে, এই সব ফুটপাথ ব্যবসায়ীরা যেভাবে রাস্তাঘাট দখল করে বছরের পর বছর ব্যবসা চালিয়ে গিয়েছেন, তাদেরও রাস্তাঘাট পথচারীদের চলাচলের ন্যূনতম ব্যবস্থা রেখে পসার সাজিয়ে বসার ক্ষেত্রে তাদেরও অনেক দায়িত্বশীল আচরণ করা উচিত ছিল, এই বিষয়ে ওয়াকিবহাল ব্যক্তিরা সবাই যে একমত, রাজ্য সরকারও তা জানে।
এই প্রসঙ্গে বিশ্বের সর্ববৃহৎ রেলস্টেশন হাওড়া, শিয়ালদা স্টেশনের কথা উল্লেখ করতেই হয়। ভাবা যায়, এইরকম সব অতিগুরুত্বপূর্ণ ব্যস্ত, অতিব্যস্ত স্টেশনের আশপাশ এলাকা তো বটেই, রেল প্ল্যাটফর্মে ঢোকার মুখগুলিতেও হকারেরা যেভাবে সব বেদখল করে দিনের পর দিন ব্যবসা চালিয়ে এসেছে, সাধারণ যাত্রী নিত্যযাত্রীদের কাছেও তা সবসময়ই অসহ্য ঠেকত। কিন্তু তখন জনতা ছিলেন নিরুপায়। ক্ষমতায় এসেই রেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা-সমঝোতা করে “পহেলা রাতেই বিড়াল মেরে দিয়েছে রাজ্য সরকার”। হাওড়া, শিয়ালদহ, দমদম, বর্ধমান সহ ব্যস্ত সব রেল স্টেশন থেকে হকারদের দাপাদাপি, জোর জবরদস্তি, জুলুমবাজি সব রাতারাতি উচ্ছেদ করে দেওয়া হয়েছে। এটাই তো এতদিন চেয়েছিলেন সাধারণ মানুষ, রেল যাত্রী, নিত্যযাত্রীরা। তারা প্রাণ খুলে আশীর্বাদ জানাচ্ছেন শুভেন্দু বাবু এবং তাঁর সরকার এবং পাশাপাশি রেল কর্তৃপক্ষকে। দীর্ঘ যুগ পরে স্বস্তি মিলেছে নাগরিকদের।
এখানে উল্লেখ্য, বিশেষ একটি সম্প্রদায়ের সাতখুন মাফ। বেআইনি মাদ্রাসা চলছে, চলবে। সরকার স্বীকৃত মাদ্রাসাতেও “বন্দেমাতরম” গাওয়া হবে না। পহেলা রাতেই বিড়াল মারার মতো বর্তমান সরকার স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছে, আইনের চোখে সবাই সমান। শিক্ষা দফতরের নির্দেশ মানতে বাধ্য রাজ্যের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে “বন্দেমাতরম” গাইতেই হবে। ছাত্রছাত্রী থেকে শুরু করে শিক্ষক-শিক্ষিকাদের। স্বাস্থ্য থেকে শিক্ষা, অর্থ থেকে শিল্প, সব ক্ষেত্রেই দ্রুত কাজে নেমেছেন বিজেপির মন্ত্রীরা। মুখ্যমন্ত্রীর কড়া নির্দেশে একটা বিশ্বাস ঝাঁকুনি দিয়ে রাজ্যজুড়ে প্রশাসনিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক সব ক্ষেত্রেই কর্মযজ্ঞ শুরু করা হয়েছে। সরকার চাইছে, মাটি নরম থাকতেই মূর্তি তৈরির কাজ শুরু করে দিতে। আর তাই, পহেলা রাতেই বিড়াল মারার এই পদক্ষেপ। আপাতত তা সফল।