Share it

শ্যামল মুখোপাধ্যায়: রাজ্যে নতুন করে পাঁচটি জেলা গঠনের প্রক্রিয়ায় দ্রুত গতিতে এগোচ্ছে রাজ্য সরকার। একইসঙ্গে ন’টি নতুন পুরসভা গঠনের প্রাথমিক পর্বের কাজে হাত দেওয়া হয়েছে ইতিমধ্যেই। সরকারি কোনও কাজে ঢিলেমি, দীর্ঘসূত্রিতা, লাল ফিতের বজ্রআঁটুনি যে আর বরদাস্ত করা হবে না তা জোরালো ভাষায় ঘোষণা করে দিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত তাঁর পেশ করা এই অর্থবর্ষের (২০২৬-২০২৭) বাজেটে যেসব ঘোষণা করেছেন, তা পরিপূর্ণ রূপায়ণের পথে ক্ষিপ্রতার সঙ্গে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন রাজ্যে সরকারের একদম নিচুতলা থেকে শুরু করে উপর মহলের ছোট-বড় কর্তারা।

বাজেটে ঘোষণা মতোই, রাজ্যে নতুন করে পাঁচটি জেলা গঠনের প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে দ্রুতগতিতে। কলকাতায় আগেই জেলা হিসেবে কাজ হত। তবে এই কলকাতাকে পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে ঘোষণার দাবি ছিল বহুদিনের। ওয়াকিবহাল ব্যক্তিদের মতে কলকাতাকে পূর্ণাঙ্গ জেলা হিসেবে গড়ে তোলা গেলে প্রশাসন, পুলিশ, কর্পোরেশন, স্বাস্থ্য এবং রাজ্য সরকারের নানা দফতরের উন্নয়নমূলক সব কাজের মধ্যে পারস্পরিক সমন্বয় আরও দৃঢ় হবে। তবে কলকাতা, বৃহত্তর কলকাতা এবং লাগোয়া এলাকাগুলোর সীমানা নির্ধারণের ক্ষেত্রে এখনও বেশ কিছু জটিলতা রয়েছে। কিছু নথিপত্র হস্তান্তরের ক্ষেত্রেও সমস্যা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সেইসব সমস্যার আশু সমাধানে দক্ষ কর্মীরা ইতিমধ্যেই কাজ শুরু করে দিয়েছেন বলে নবান্ন সূত্রের খবর।

হুগলির আরামবাগ মহকুমাকে পৃথক জেলা হিসেবে ঘোষণার দাবি উঠেছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিত পরেই। সালটা ছিল ১৯৫১-৫২। এই জেলা থেকে শুধু রাজ্যেরই নয়, ভারতখ্যাত বহু রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক জগতের ব্যক্তিত্ব উঠে এসেছিলেন। এঁদের মধ্যে কয়েকজন প্রাতঃস্মরণীয় ব্যক্তিও রয়েছেন। তাঁদের প্রায় প্রত্যেকেইআরামবাগকে ঘিরে একটি জেলা ঘোষণার দাবি জানিয়ে এসেছেন বারবার। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি এতদিন। শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে এই প্রথম রাজ্যে বিজেপি সরকার এসেই তাদের প্রথম মন্ত্রিসভার বৈঠকে আরামবাগ মহকুমাকে জেলা হিসেবে মর্যাদা দেওয়ার ঘোষণা করে দিয়েছেন। আরামবাগবাসীর সামনে আরও ভালো খবর, এই আরামবাগ জেলার মধ্যে কামারপুকুরকে পুরসভার মর্যাদা দেওয়ার ঘোষণাও হয়েছে।

নবান্ন সূত্রের খবর, উত্তর এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা, এই দুই জেলার কিছু কিছু ব্লককে নিয়ে পৃথক সুন্দরবন জেলা গঠন করার ব্যবস্থাও হচ্ছে। সুন্দরবন এলাকার বাসিন্দাদের দীর্ঘ যুগের দাবি ছিল এই সুন্দরবন জেলা ঘোষণার। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সুন্দরবনবাসীর দীর্ঘদিনের এই দাবিও পূরণ করে দিলেন। সন্দেশখালি, হিঙ্গলগঞ্জ মিনাখা ও হাড়োয়া ব্লক প্রস্তাবিত বসিরহাট জেলা থাকবে, না সুন্দরবন জেলার ঢোকানো হবে তা নিয়েই প্রশাসনিক পর্যায়ে ব্যাপকভাবে কাজ শুরু করে দেওয়া হয়েছে।

একইসঙ্গে মুর্শিদাবাদের জঙ্গিপুরকে আলাদা জেলা করার ঘোষণা করে দিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। জঙ্গিপুরকে জেলা করার কথা বিগত সরকারের বিবেচনাধীন ছিল। কিন্তু বাস্তবায়িত হয়নি। শুভেন্দু বাবু স্পষ্ট বক্তব্যের এবং প্রতিশ্রুতির মর্যাদা রাখেন বরাবরই। তাই জঙ্গিপুরবাসী এবার আশায় বুক বেঁধেছেন। জঙ্গিপুর এখন বহরমপুর জেলার অধীনে রয়েছে। বহরমপুর থেকে জঙ্গিপুরের দূরত্ব প্রায় ১০০ কিলোমিটার। এলাকাবাসীর স্পষ্ট বক্তব্য,এই দূরত্বে সঠিকভাবে প্রশাসনিক কাজকর্ম চালানো কার্যত অসম্ভব। বর্তমান গতিশীল যুগে এভাবে চলা বাঞ্ছনীয়ও নয়।

বিজেপিকে উত্তরবঙ্গের আপামর জনতা বারবার ঢেলে সমর্থন দিয়েছেন। তার পূর্ণ মর্যাদাও রাখতে চায় বিজেপির সরকার। এবারের বিধানসভা নির্বাচনের আগে তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারী, বিজেপি নেতার শঙ্কর ঘোষ সহ স্থানীয় বিজেপি নেতারা বিজেপির সরকার ক্ষমতায় এসেই উত্তরবঙ্গবাসীকে কী কী সুযোগ, সুবিধা দেওয়া হবে তা নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বারবার। শুধু এই রাজের নেতারাই নন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ সহ কেন্দ্রীয় স্তরের নেতারাও উত্তরবঙ্গের মানুষের জন্য উন্নয়নের ঢালাও প্রতিশ্রুতি দিয়ে গিয়েছেন বারবার। উত্তরবঙ্গের নেতা তথা শিলিগুড়ির বিধায়ক-মন্ত্রী শঙ্কর ঘোষের কথায়, “আমরা ভীষণ খুশি। উন্নয়নের কাজ সবে শুরু করা হয়েছে। উন্নয়নের কাজের গতি আরও বাড়ানো হবে। সেই মতই এগোচ্ছে রাজ্য সরকার।”

এবারের রাজ্য বাজেটে উত্তরবঙ্গের জন্য পাঁচটি নতুন পুরসভা গঠনের প্রস্তাবও রাখা হয়েছে। দার্জিলিংয়ের পাহাড়ে সুবাস ঘিসিং-এর নেতৃত্বে নেতৃত্বে জি এন এল এফ আন্দোলনের সময় উত্তরবঙ্গে রাজনৈতিক সংবাদদাতা হিসেবে বেশ কয়েক বছর কাটিয়েছি। পরেও শিলিগুড়ি তথা উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন দলের রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রেখে চলেছি আজও। দার্জিলিং, কার্শিয়াং, কালিঙ্পং-এর মতো পাহাড়ি এলাকা ছাড়াও উত্তরবঙ্গের প্রতিটি জেলা এবং মহকুমায় নিবিড় জনসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছি বহু বছর ধরেই। সেইসব অভিজ্ঞতা থেকে স্পষ্ট লিখতে পারি, এলাকার সার্বিক পরিস্থিতির ব্যাপক বদল ঘটেনি এখনও। সেই বদলানোর কাজটাই করতে চাইছে বিপুলভাবে ক্ষমতায় পৌঁছনো বিজেপি সরকার। উত্তরবঙ্গের জন্য পাঁচটি নতুন পুরসভা গঠন করার প্রক্রিয়া চালানো হচ্ছে।

মালদহের চাঁচল, গাজল, দার্জিলিং পাহাড়ের শিবমন্দির, আলিপুরদুয়ারের জায়গাঁ, উত্তর দিনাজপুরের টুঙ্গিদিঘী এলাকাকে পুরসভা হিসেবে গঠনের কথা বলা হয়েছে এবারের রাজ্য বাজেটে। ভুটান সীমান্তের জায়গাঁ এলাকা একটি বিরাট বাণিজ্য কেন্দ্র। এতদিন ছিল প্রশাসনিক ভাবে দুর্বল। পুরসভা চালু হয়ে গেলে প্রশাসনিক স্তরে আরও মজবুত হয়ে উঠবে জায়গাঁ। পুরসভা করা হবে হাওড়ার বাগনান, পশ্চিম মেদিনীপুরের বেলদা, পূর্ব মেদিনীপুরের কোলাঘাটকে।

Share it