Share it

যীশু চৌধুরী: বাঙালির ইতিহাস অনেক পুরনো। মাঘধী অপভ্রংশ থেকে উদ্ভব হয়েছে বাংলা ভাষার। সেকারণে বলা যায় অন্যান্য আধুনিক ভারতীয় ভাষার মতো বাংলাও হাজার বছর পেরোল। তবে বাঙালি জাতি ভাষার ভিত্তিতে না হলেও তার আগে থেকেই ছিল।

বাংলা ভাষার যে নজির পাওয়া যায় তা প্রায় হাজার বছরের পুরনো। চর্যাপদ থেকে এই নিদর্শন গণ্য হয়ে থাকে। তবে এই চর্যাপদ প্রথম খুঁজে পান দীনেশচন্দ্র সেন, নেপালের রাজ পাঠাগার থেকে। অনুমান করা হয় বৌদ্ধ ভিন্নযান ধর্মের মানুষজন যে গান গাইতেন সেই গানগুলি এই চর্যাপদ। এ কারণে একে চর্যাপদ গীতিকা বলে উ্ল্লেখ করা হয়ে থাকে।

শুধু বাঙালি জাতি নয়. বাংলা ভাষার ওপরেও বারবার আঘাত এসেছে নানা দিক থেকে। কিন্তু, এত দৃঢ় ভিত্তি এই জাতির তাকে নিশ্চিহ্ন করার চেষ্টা করলেও কেউ করতে পারেনি। কবি জয়দেব বা কবি বিদ্যাপতি থেকে নির্দিষ্টভাবে বাংলা সাহিত্যের অভিযান শুরু হয়েছে। তুর্কি আমলে এসে এই ভাষার ওপর অত্যাচার হয়েছিল সবচেয়ে বেশি। কিন্তু, বাংলা ভাষা এমনই উদার এবং অবাধ বহু তুর্কি শব্দ ও অনুসঙ্গ ভাষার আয়ত্ত্ব করে নেয় এবং সমৃদ্ধ হয়। পরে বহু ভাষার প্রভাবে বাংলা এভাবেই সমৃদ্ধ হয়েছে। সেই সমৃদ্ধি এখনও সমানভাবে প্রবাহিত।

বাঙালি জাতির ওপরে যেমন বারবার হামলা এসেছে তেমনই সেই জাতির মধ্যে থেকেই তার প্রতিরোধ গড়ে উঠেছে ব্যাপকভাবে। কেবল তুর্কি আমল নয়, পাঠান ও মোগল যুগেও বাঙালির ওপর আক্রমণ এসেছে। ব্রিটিশ আমলে তো বটেই।

বহু আগে, যীশু খ্রিষ্টের জন্মেরও আগে এক দ্বিগ্বিজয়ী যোদ্ধা আলেকজান্ডার ভারতের পশ্চিমাঞ্চল দিয়ে ঢুকেছিলেন এই দেশ দখল করবেন বলে। কিন্তু, তিনি দেশের পশ্চিমাংশ দখল করার পরেও পূর্বদিকে আর এগোতে চাননি। তিনি শুনেছিলেন, গঙ্গারিডি বঙ্গভূমি নৌবাহিনী এতই শক্তিশালী যে তার সঙ্গে তিনি কোনওমতেই পেরে উঠবেন না। ফলে ফিরে যান আর নিজের দেশের দিকেই। কিন্তু দেশে ফেরার আগেই মিশরে মাত্র ২৯ বছর বয়সেই তিনি মারা যান। মিশরের এই অংশকে বলা হয় আলেকজান্ড্রিয়া।

বাংলার নৌবাহিনী সম্পর্কে দীর্ঘদিন ধরেই সারা ভারতের মানুষ অত্যন্ত সচেতন ছিলেন। মোগলরা যখন ভারতের অনেকটা অংশই দখল করে তখন তারা বাংলায় সহজে ঢুকতে চায়নি। পরে শাহজাহান তাঁর ছেলে সুজাকে বাংলা তালুক শাসনের জন্যে পাঠিয়েছিলেন। সেই ইতিহাস অবশ্য আলাদা। মোগলরা না ঢুকলেও পাঠানরা কিন্তু বেশ কিছুদিন ধরেই বাংলাতে অবস্থান করছিল। তবে এইসব পাঠান শাসকের মাথার ওপরে কোনও কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ছিল না। যে যার নিজের মতো করে এলাকা শাসন করতেন। এমনই এক পাঠান শাসকের বিরুদ্ধে উত্থানে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন নবদ্বীপের সংস্কৃত পণ্ডিত শ্রী গৌরাঙ্গ দেব। তাঁর প্রতিবাদ আন্দোলনে মাথানত করেছিলেন ওই অত্যাচারী পাঠানশাসক। পরবর্তীকালে আমরা ওই নেতাকে মহাপ্রভু শ্রী চৈতন্য বলে জানি। তিনি শুধু মধ্যযুগীয় শাসনের বিরুদ্ধে সার্বিক আন্দোলনই করেননি তাঁর নানা আচরণ ও আন্দোলনের ভিতর দিয়ে মধ্যযুগের বাংলায় গড়ে উঠেছিল সংস্কৃতির এক নতুন দিগন্ত। অনেকে একে বাংলার মধ্যুযুগে রেনেসাঁ বলে উল্লেখ করেছেন। আজও পর্যন্ত সেই রেনেসাঁর প্রভাব বাঙালির সংস্কৃতি ও মননে রয়ে গেছে।

আধুনিক যুগের ইতিহাস শুরু হয়েছে ইস্ট ইন্ডিয়া কম্পানি বাংলায় আসার পর থেকে। এসময় বাংলার স্বাধীন নবাব ছিলেন সিরাজউদ্দৌলাহ। ব্রিটিশ কম্পানি তাঁকে ছলে বলে কৌশলে পরাস্ত করে এবং নৃশংভাবে খুন করে। এই সময় অনেকে বলেন, ভারতের পরাধীনতার যুগ শুরু হয়েছে ওই পলাশীর প্রান্তর থেকেই। পলাশীর যুদ্ধেই সিরাজ পরাজিত হয়েছিলেন নানা চক্রান্তের ফলে। কবি নবীনচন্দ্র সেন লিখেছিলেন, “এই বাংলায় ডুবিয়াছে হায় ভারতের দিবাকর“।

কিন্তু, সেই পরাজয় থেকে বাঙালিকে রুদ্ধ করে রাখা যায়নি। ইতিহাসে একে একে এসেছেন রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, শ্রী রামকৃষ্ণ দেব, মা জননী সারদা, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, স্বামী বিবেকানন্দ প্রমূখ। এছাড়া এই সময়ে বাঙালির চৈতন্যে অবদান রেখেছেন প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর, মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর, ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেন, ঋষি অরবিন্দ এবং ভগিনী নিবেদিতা। বাঙালিকে গৌরবোজ্জ্বল করেছেন আচার্য জগদীশচন্দ্র বসু, আচার্য প্রফুল্লচন্দ্র রায়, ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, আচার্য সত্যেন্দ্রনাথ বসু, বিজ্ঞানী মেঘনাথ সাহা, বিজ্ঞানী জ্ঞান ঘোষ প্রমূখ। বিদ্যার ক্ষেত্রে নতুন বিষয় পরিসংখ্যানতত্ত্ব নিয়ে এসেছিলেন প্রশান্তচন্দ্র মহালানবিশ। তাছাড়া উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অবদান রেখেছিলেন স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায়। তাঁকে বলা হত “বাংলার বাঘ”। তখনকার ইংরেজ শাসকরাও তাঁকে যথেষ্ট সমীহ করতেন। পশ্চিমবঙ্গের রূপকার ডাক্তার বিধানচন্দ্র রায়ের নামও আমাদের মাথায় রাখতে হবে।

স্বাধীনতা যখন বিপন্ন হয়েছে তখনও বাঙালি এক ক্ষণের জন্যেও ঘরে বসে থাকেনি। রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন “ওরা পরকে আপন করে, আপনারে পর/বাহিরে বাঁশির রবে ছেড়ে যায় ঘর”। পরাধীন দেশকে স্বাধীন করার জন্যে বাইরে বেরিয়ে এসেছিলেন বহু কিশোর-তরুণ, কিশোরী-তরুণী, শহিদ ক্ষুদিরাম এবং প্রফুল্ল চাকী কম বয়সে প্রাণ দিয়েছিলেন দেশের জন্য। এরকম আরও বহু বাঙালি শহিদ হয়েছেন সারা ভারতকে স্বাধীন করার জন্য। মাস্টার দা সূর্য সেন এবং বাঘাযতীন যথাক্রমে চট্টগ্রামে ও বুড়িবালামের তীরে ইংরেজ বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাণপণ লড়াই করেছিলেন। তাঁদের সেই আত্মবলিদান বাঙালির ইতিহাসেই লেখা হয়ে আছে। আর ছিলেন সুভাষচন্দ্র বসু। যিনি দেশকে স্বাধীন করার জন্যে বাইরে চলে যান এবং বাহিনী গঠন করে ব্রিটিশের বিরুদ্ধে লড়াই করে কোনও কোনও জায়গা দখলও করে নেন। তাঁর আজাদ হিন্দ বাহিনীর নেতাজি হিসেবে তিনি তাঁর সহযোদ্ধাদের সমীহ আদায় করে নিয়েছিলেন এবং সেই সহযোদ্ধারাও প্রাণ দিতে দ্বিধা করেননি।

আজ আমরা আবার, বাঙালিরা পুনরায় এক কঠিন বিপদের মুখে এসে দাঁড়িয়েছি। এই বিপদ থেকে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য তার পুরনো ইতিহাস তাকে মনে করতেই হবে। ইতিহাসের মূল্য সেটাই। সেই মহান বীরের ইতিহাসকে মনে রেখে বাঙালিকে আবার যাবতীয় বিপদ উত্তীর্ণ হয়ে জয়ের পথে ফিরে আসতে হবে এবং সামনে দিকে মাথা উঁচু করে আরও এগিয়ে যেতে হবে। কোনও নিচতার কাছে, কোনও ধর্মান্ধতার কাছে, কোনও হীনতার কাছে, কোনও বিচ্ছিন্নতার কাছে বাঙালিকে কোনওভাবেই মাথানত করতে হবে না। বাঙালির ইতিহাসই তার ধারাবাহিক উদাহরণ।

Share it