শ্যামল মুখোপাধ্যায়: নির্বাচনের রণক্ষেত্রে এবার হচ্ছেটা কী? উন্নয়নের ঢাক-ঢোল, সযত্নে লালিত, সুন্দর করে গাঁথা ফুলের মালাগুলি ঘরের এক কোণে ঢাকা দিয়ে রাখা। পরিবর্তে শুধু “পাইয়ে দেওয়া”, নানা রকম প্রলোভনের বিচিত্র সব গান গেয়ে দেশের এবং এই রাজ্যের সব ক”টি যুধুধান দলই নির্বাচনী বৈতরনী পার হতে চাইছে, হই হই করে।
কোথায় গেল আলো, রাস্তা, সেতু তৈরির সেই সব দুর্দান্ত প্রতিশ্রুতি? উন্নয়নের কাহিনি যে সব বস্তাবন্দি। এখন সাফ কথায় কষ্ট নাই। “আমার ঝোলা পকেটে নগদে কত দিবা বলো, তারপর আসো ভোটের গপ্পে”। এই সিধা কথা বুঝে গিয়েছে রাজনৈতিক দলগুলিও। শুরুটা হয়েছিল রাজধানী দিল্লিতে। “প্রলোভনের থোলে” নিয়ে নির্বাচনে নেমে পড়লেন অরবিন্দ কেজরিওয়াল। “আপ দলের” নেতা। নির্বাচনী যুদ্ধে আপ নেতা কেজরিওয়াল এমনভাবে প্রলোভনের ফুলের মালা ছুড়তে শুরু করে দিলেন, তা দেখে হতবাক সবাই। মেয়েরা বাসে, ট্রামে চাপলেই ভাড়া নেওয়া হবে না। সব “ফ্রি”। তাঁর প্রলোভন দেওয়ার রাজনীতির ধাক্কায় মুখ থুবড়ে পড়ল কংগ্রেসি মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর দিল্লিকে সাজিয়ে তোলার সেই বহুচর্চিত উন্নয়ন প্রকল্পগুলি। উন্নয়নে ঘাটতি ছিল না, তা স্বচক্ষেই প্রত্যক্ষ করে এসেছি একাধিকবার। ভোটাররা শোনেননি প্রবীণা সেই মহিলা মুখ্যমন্ত্রীর আন্তরিক আবেদন। “প্রলোভন”, “পাইয়ে দেওয়া” এবং “নগদ প্রাপ্তির” সেই ঝোড়ো প্রচারে হেরে গেলেন কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর দল। হই হই করে জিতে বেরিয়ে এলেন “আপ দলের” নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল। সারা দেশ বুঝে নিল, চুলোয় যাক তোর উন্নয়ন। ভোট আসছে, নগদ ছড়াও। কিনে নাও প্রলোভনের ভোট। হরিয়ানা, পাঞ্জাব, উত্তরপ্রদেশ, ছত্তিশগড়, ঝাড়খণ্ড হয়ে নেমে এল বিহারে! এই তো সেদিন, বিহারের ভোটের ফলাফল নির্ধারিত হল নগদ বিদায়ে। হেরে গেল লালু প্রসাদের দল, কংগ্রেস সহ বিরোধী দলগুলি। হেরে গেল বললে ভুল হবে। কার্যত শুয়ে পড়ল। উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি গোল্লায় যাক। টাকার মালা ছোড়ো, তাহলেই কেল্লাফতে।
দান ক্ষয়রাতির এত অর্থ আসবে কোথা থেকে? লাগে টাকা দেবে “গৌরী সেন”। ঋণং কৃত্বা ঘৃতং পিবেৎ। ভোট চাই-তাই ধার করো, আরও ধার করো। এ এক অদ্ভুত নির্বাচন। ঋণ করে নগদ বিলির নির্বাচন।
আর এই মুহূর্তে পশ্চিমবঙ্গে হচ্ছেটা কী? শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস ঘোষণা করেছে-”দিদির উপহার”! “লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে” মাসিক ৫০০ টাকা বৃদ্ধি। সাধারণ মহিলাদের ঘরে ঘরে ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাচ্ছে প্রতিমাসে ১৫০০ টাকা। তপশিলি জাতি, জনজাতি সম্প্রদায়ের মহিলাদের জন্য প্রতিমাসে আরও ২০০ টাকা বেশি। অর্থাৎ ১৭০০ টাকা। এখানেই শেষ নয়। যুবদের পাশে “জীবিকার আশ্বাসে” “বাংলার যুবসাথী” প্রকল্পে মাসে ১৫০০ টাকা। বার্ধক্য ভাতা, কৃষক ভাতা, কন্যাশ্রী, যুবশ্রী, পথশ্রী, অঙ্গনওয়াড়ি পরিষেবার মাধ্যমে ছয় বছরের নিচে ৬৮ লক্ষ ৫৮ হাজার শিশু এবং ১১ লক্ষ ২৬ হাজার গর্ভবতী ও প্রসূতি মায়েদের জন্য প্রতিমাসে ২৫ দিন করে নিয়মিত রান্না করা খাবার দেওয়া হচ্ছে। এই রকম ১৪৭ রকম নগদ ভাতার ঘোষণা করে এবং বেশ কয়েকটি ক্ষেত্রে নগদ অর্থ প্রাপকদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে নিয়মিত পাঠিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে ইতিমধ্যেই। এরপরেও কি বলতে হবে মহিলা ভোটার, যুবক-যুবতী, কৃষিজীবী সম্প্রদায়, জনজাতি উপজাতি সম্প্রদায়ের ভোট কাদের পক্ষে যাবে? আর সংখ্যালঘুদের জন্য যে বিপুল পরিমাণ আর্থিক সাহায্য নানা প্রকল্পে দেওয়া হচ্ছে তার সবিস্তার তথ্যে আর যাচ্ছি না। তাতে লেখাটি বড় হয়ে যাবে। সেও এক বিপুল পরিমাণ নগদ অর্থ বিলির নানা প্রকল্প।
গিয়েছিলাম বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, ঝাড়গ্রাম, পূর্ব ও পশ্চিম মেদিনীপুর এলাকার জঙ্গলের বিভিন্ন জায়গায়। সুসজ্জিত সরকারি অতিথিশালার আশপাশের এলাকার জনজাতি উপজাতি সম্প্রদায়ের কাছে ভোটের প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়েই বিজেপির হাল-হকিকৎ জানতে চাইলাম। গরিব মানুষদের একটাই কথা- “তৃণমূল তো আমাদের অনেক টাকা দিচ্ছে।” ডান হাতের অনামিকা এবং বৃদ্ধাঙ্গুষ্ঠ ঘষে দেখিয়ে প্রবীণ প্রদীপ মাহাত বললেন, “বিজেপি বড় দিবেক বটে। দিলে ভোট, না হলে নয়”। উন্নয়নের প্রশ্ন নৈব নৈব চ। রাজনৈতিক সাংবাদিক হিসাবে দীর্ঘ বছর শুধু এই রাজ্যেই নয়, রাজ্যের বাইরেও লোকসভা, বিধানসভা, পঞ্চায়েত নির্বাচন কভার করেছি। রাস্তা নেই কেন? পানীয় জল কোথায়? আবাসের কি হবে? পেটের ভাতের সমস্যা কীভাবে মিটবে- এইসব প্রশ্নকে দূরে – বহু দূরে সরিয়ে রেখে নগদে পকেটে কি আসবে – এই প্রশ্ন, এই বক্তব্য। বর্তমান সময়ের নির্বাচনী প্রচারের দিনগুলিতে শুনতে হচ্ছে সর্বত্র।
ভোটারদের এইসব প্রশ্ন ইতিমধ্যেই প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে এই রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান প্রতিপক্ষ বিজেপি দলের নেতৃত্বদের হৃদয়েও। একদিকে তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং বিপরীতে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। এরা যুবকদের দিচ্ছেন মাসে ১৫০০ টাকা। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীজির গ্যারান্টি, “যুবশক্তি ভরসা কার্ড”। মানে রাজ্যের শাসকদলের দেওয়া “যুবকদের পাশে – জীবিকার আশ্বাসের” সেই ১৫০০ টাকার ঠিক দ্বিগুণ। দেওয়া হবে প্রতি মাসে ৩০০০ টাকা। “লক্ষ্মীদের জয়, স্বনির্ভরতা অক্ষয়”- মমতা দিচ্ছেন ১৫০০ টাকা। বিজেপিই বা পিছিয়ে থাকবে কেন? প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা, ৭৫ লাখ মহিলাকে “লাখপতি দিদি” বানিয়ে দেওয়া হবে রাতারাতি। দিল্লির প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী, আপ নেতা অরবিন্দ কেজরিওয়াল, পদ ধরেই এই রাজ্যে বিজেপিও সশব্দে ঘোষণা করেছে, সরকারি বাসে মহিলাদের যাতায়াত সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। আর “মাতৃশক্তি ভরসা কার্ড”? বিজেপি বলছে, “মাতৃশক্তি ভরসা কার্ডে” দেওয়া হবে সব মহিলার জন্য প্রতিমাসে ৩০০০ টাকা। অর্থাৎ মমতার দেওয়া অর্থের দ্বিগুণ। এইরকম গুচ্ছ গুচ্ছ নগদ বিদায়ের ঘোষণা।
প্রশ্ন এখানেই। রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস, কেন্দ্রের শাসকদল বিজেপি যে এইভাবে জলের মতো অর্থ খরচ করবে, সে টাকা আসবে কোথা থেকে? রিজার্ভ ব্যাংক কী আরও ঋণ করায় আপত্তি জানাবে না? কিন্তু কে শোনে কার কথা? নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে হবে – কথা এখন একটাই। প্রশ্ন সেই একটাই। হচ্ছেটা কী?