ছবিটি AI দ্বারা নির্মিত
Share it

শ্যামল মুখোপাধ্যায়: শেষ মুহূর্তেও কংগ্রেসের সঙ্গে জোট হলো না সিপিএম তথা বামেদের। দক্ষিণ ২৪ পরগনার একদা তৃণমূল কংগ্রেসের জঙ্গি নেতা আরাবুল ইসলামকে হই-হই করে আইএসএফ দল অর্থাৎ নওশাদ সিদ্দিকী তাঁদের দলের প্রার্থী ঘোষণা করে দিলেন। সিপিএম এবং বামেদের তীব্র আপত্তিকে তোয়াক্কাই করেননি আইএসএফ দলের নেতারা। গত রবিবার ৫ এপ্রিল (২০২৬) কলকাতা প্রেস ক্লাবে সাংবাদিক সংগঠনের একটি অনুষ্ঠানে বামফ্রন্টের চেয়ারম্যান প্রবীণ সিপিএম নেতা বিমান বসুর সঙ্গে দেখা হল। একান্তে কিছু কথাও হল। এই কলকাতা শহর এবং রাজ্যের দীর্ঘদিনের এক জন রাজনৈতিক সংবাদদাতা হিসেবে নিশ্চিন্তে লিখে দিতে পারি যে সিপিএমের মতো একটা রাজনৈতিক দলের এই করুণ অবস্থা চাক্ষুষ করতে হবে স্বপ্নেও কখনও ভাবিনি। প্রশ্ন ছিল,- মুর্শিদাবাদের বহিষ্কৃত তৃণমূল নেতা হুমায়ুন কবীর, মিম নতুন দল করে রাজ্য বিধানসভার ভোটে লড়তে নেমেছেন তার সঙ্গে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিম যে নিউটাউনের একটা পাঁচতারা হোটেলে দিনের পর দিন আসন সমঝোতার করুণ আবেদন নিয়ে রুদ্ধধার বৈঠক করছেন দল কি তা জানত? সম্ভবত না। সিপিএমের একসময়ের লড়াকু ছাত্র-যুব নেতা প্রতীকউর রহমান এই রাজনৈতিক সংবাদদাতাকে নানা প্রশ্নের জবাবে স্পষ্ট জানিয়েছেন, “যে মুসলিম নেতা বলেন, ৩০ শতাংশ হিন্দুকে যখন তখন কেটে গঙ্গায় জলে ভাসিয়ে দিতে পারেন, সে ক্ষমতা তাঁর আছে – এইরকম আদ্যন্ত একজন নেতার সঙ্গে সিপিএম দলের রাজ্য সম্পাদক গোপন বৈঠক করছেন, এটা কি ভাবা যায়? প্রতীকউর-এর মতো সিপিএমের বহু ছাত্র-যুব নেতার প্রশ্নও সেই এক। এই বিষয়ে নেতাদের কাছে স্পষ্ট উত্তর চাইলেই প্রতীকউর-এর মতো সম্ভাবনাময় দলীয় নেতাদের বহিষ্কার করা হচ্ছে। তাঁদের কথায়, “আলিমুদ্দিনের সিপিএম পার্টি অফিসে এখন শ্বাসরুদ্ধ করা অবস্থায। দলটার হল কী?

গত সংখ্যায় এই কাগজেই লিখেছিলাম, এবারের বিধানসভা নির্বাচনী প্রচারে সিপিএম-সহ বামফ্রন্টের এই করুণ হাল কেন, তার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ে দু”চার কথা পাঠকদের জানাব। আপাতত তৃণমূল কংগ্রেস, বিজেপি, কংগ্রেস, আইএসএফ বা মিম নামের দলটির নির্বাচনী প্রচার নিয়ে সবিস্তার লিখছি না। এ বিষয়ে ইতিমধ্যেই লেখা হয়েছে। লেখা হবে আরও। তাদের খবর এখনও আছে।

তবে প্রশ্ন একটাই। সিপিএম দলের হল টা কী? ফিরে যাই ১০৬ বছর আগের একটি ঐতিহাসিক ঘটনায়। সালটা ছিল ১৯২০ সালের অক্টোবর মাস। রাশিয়ার তাসখন্দে “প্রথম প্রবাসী ভারতের” কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিআই) প্রতিষ্ঠা করেন কিংবদন্তি নেতা এম এন রায়। পুরো নাম মানবেন্দ্রনাথ রায়। এই পার্টির প্রাথমিক সদস্যদের মধ্যে ছিলেন এম এন রায়ের স্ত্রী এভলিন ট্রেন্ট রায়। অবনী মুখোপাধ্যায় এবং মোঃ সফিক ছিলেন প্রাথমিক সদস্য। এই চারজন ছাড়াও আর কেউ সেই সিপিআই দলের সদস্য ছিলেন কী-না, তা নিয়ে বহু খোঁজখবর তত্ত্বতলাশ করেও সঠিক দিশা কিছু পাইনি। পাঠকদের মধ্যে যদি কারও কাছে এম এন রায়ের গঠিত সেই সিপিআই দলের সদস্যদের নাম, পরিচয় থাকে জানালে খুবই উপকৃত হব।

রাশিয়ার তাসখন্দ ছেড়ে এবার ভারতের মাটিতে আসি। এই দেশের মাটিতে ১৯২৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর কানপুরে গঠিত হল “কমিউনিস্ট পার্টি অফ ইন্ডিয়া”। এর প্রথম কনভেনার হলেন সত্য ভক্ত। এছাড়াও নেতৃত্বে ছিলেন এস বি খাটে (প্রথম সাধারণ সম্পাদক), এস এ ডাঙ্গে প্রমূখ। পার্টি এগোল দ্রুতগতিতে। পার্টি হোঁচট খেল ১৯৬৪ সালে। তীব্র দলীয় ঝগড়ায় পার্টি ভাঙল। সিপিআই ভেঙে তৈরি হল সিপিআই(এম) সংক্ষেপে সিপিএম। এরপরেও দল ভেঙেছে বারবার। দল ভেঙে হল চারু মজুমদারের নকশাল দল। তারপর এল আরও উগ্র বাম।- “মাওবাদী সংগঠন”। হাতে বন্দুক এবং মারাত্মক সব আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে পাহাড়ে জঙ্গলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ল মাওবাদী জঙ্গিরা। এদের নীতি, তত্ত্ব, আদর্শ, বক্তব্য সবকিছুই এই রাজনৈতিক সংবাদদাতার কাছে আছে, তা নিয়ে পরবর্তীতে আলোচনা করা যাবে। এখন ফিরে আসি সিপিএম দলের অবস্থান, হাল-হকিকৎ সম্পর্কে। কিছু খবর পাঠকদের জানানোর বিষয়ে। ১৯৭৭ সালে সিদ্ধার্থ শংকর রায়ের মতো দোর্দ্যণ্ডপ্রতাপ কংগ্রেস মুখ্যমন্ত্রী এবং তাঁর দলবলকে হটিয়ে দিয়ে সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্ট নিঃশব্দ ব্যালটের মাধ্যমে বিপুলভাবে জয়ী হয়ে রাজ্যের ক্ষমতায় চলে এল। মুখ্যমন্ত্রী হলেন খ্যাতনামা কমিউনিস্ট নেতা জ্যোতি বসু। দলের সম্পাদক হলেন অবিসংবাদিক কমিউনিস্ট নেতা প্রমোদ দাশগুপ্ত। ক্ষমতায় আসার ঠিক এক বছর পর ১৯৭৮ সালের ৪ঠা জুন রাজ্যে পঞ্চায়েত নির্বাচন হল। ব্যাস, সিপিএম দলকে আর পায় কে? গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে রাজ্যের ৪৪ হাজার গ্রামের ঘরে ঘরে ঢুকে গেল সিপিএম। প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে যেমন একদিকে খুব ভালো হল, তলায় তলায় চোরাবালির খপ্পরে পড়ে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে পদস্খলন শুরু হল ধীর গতিতে। আদর্শকে সামনে রেখে যে দল এগিয়েছিল, ধীরে ধীরে দেখা গেল মোহ-মাৎসর্য্য, নানারকম ভয়ানক সব প্রলোভনে নিমজ্জিত হতে শুরু করলেন নেতা-নেত্রী এবং কমরেডরা। ওঁদের ওই পদস্খলনের প্রতিটি সুযোগ কাজে লাগালেন “অগ্নিকন্যা” মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

২০০৬ সালের পর পর নির্বাচনগুলি অর্থাৎ পঞ্চায়েত নির্বাচনই হোক অথবা বিধানসভা বা লোকসভা। সিপিএম তথা বামফ্রন্টের ক্ষয় আমাদের মতো রাজনৈতিক সাংবাদিকদের নজরে আসছিল। দম্ভ ক্ষমতার চূড়ান্ত অপব্যবহার এবং মমতা ব্যানার্জির মতো একজন মহিলা নেত্রীকে শারীরিক, মানসিকভাবে একের পর এক আঘাত দেওয়ার ঘটনায় বাংলার মানুষের খুব তীব্রতর হচ্ছিল। সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম, গড়বেতার ঘটনা বাংলার মানুষকে ক্ষিপ্ত করে তুলছিল সিপিএমের বিরুদ্ধে। পাঠকের নিশ্চয়ই মনে আছে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের সেই অতি দম্ভের উক্তি, “আমরা ২৩০, ওরা ৩৫। কী করে নেবে বিরোধীরা?” বর্ধমানের সাঁইবারির সেই হত্যাকাণ্ডের ঘটনার পরেও সিপিএম নেতাদের সেই নৃশংস উক্তিগুলো মানুষ যেমন কোনওদিন ভুলতে পারবেন না। একইসঙ্গে সিপিএম নেতৃত্বাধীন বামফ্রন্টের ৩৪ বছরের শাসনের সেই ভয়ানক দিনগুলি বাংলার মানুষ ভুলতে পারছেন না আজও। তাই এবারের বিধানসভা নির্বাচনেও পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে হচ্ছে সিপিএম-সহ বাম নেতাদের। শূন্যের গেরো এবারেও কাটবে বলে মনে করছেন না কেউই।

Share it