যীশু চৌধুরী: ব্রজধামে আজ হোলি খেলা। সারা ভারতই আজ যেন ব্রজধাম হয়ে উঠবে। সকাল থেকেই চারদিকে রঙের মেলা। রাস্তায় রাস্তায় নেমে আসবে বালক-বালিকা, কিশোর-কিশোরী, যুবক-যুবতির দল। ছোট থেকে বড় সকলেরই আজ লেগে যাবে রঙের বিপুল ছোঁয়া। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত এই রঙের খেলা। বিকেল হলে তারই জের হিসেবে পরস্পরকে মিষ্টি খাওয়ানো। কোথাও কোথাও অবশ্য দু”দিন ধরে চলবে হোলির উল্লাস ও উৎসব।
আসলে এ হল গিয়ে বসন্তোৎসব। সারা ছ”টি ঋতুর মধ্যে অনেকেই এই বসন্ত ঋতুকে শ্রেষ্ঠ বলে মনে করেন। তাছাড়া বিভিন্ন ভারতীয় ক্যালেন্ডার অনুযায়ী এই ঋতুই বছরের শেষ ঋতু। তারপর নতুন বছরের শুরুতে আসবে নতুন ঋতু, গ্রীস্মকাল। সেই গ্রীস্মের আগে বসন্তের এই মনোরম পরিস্থিতি অনেককেই তৈরি রাখে নতুন পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য।
সারা ভারতে অবশ্য এই ঋতুর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা ধরনের উৎসব। এই উৎসবে পূর্ব ভারতের সঙ্গে পশ্চিম ভারতের কিংবা উত্তরের সঙ্গে দক্ষিণের কোনও মিল থাকে না। এক এক জায়গা অনুযায়ী উৎসব এক এক রকম। যেমন অসমে এই সময়ই পালিত হয় রঙালি বিহু। এই বিহু তাদের চিরাচরিত উৎসবের মধ্যেই পড়ে। আবার কোথাও কোথাও “ভোগালী বিহু” পালন করা হয়। নাচ ও গানের মধ্যে দিয়ে বসন্তের এই অভিসারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। পঞ্জাবে অবশ্য সারাদিন এমনকী সারা সপ্তাহ ধরে চলে ভাঙড়া নাচের উল্লাস। এই ভাঙড়া নাচের প্রতিযোগিতাও হয় কোথাও কোথাও। রাজস্থানে হয় উট দৌড়ের প্রতিযোগিতা। বিশেষত হোলি খেলার দিনকে ঘিরে এই প্রতিযোগিতার প্রস্তুতি চলে বেশ কিছু আগে থেকেই। প্রতিযোগিতার দিন সকলে খোলা জায়গায় এসে মিলিত হন। এখানে পরস্পরকে আবিরও মাখানো হয়। প্রতিযোগিতার জন্য যেসব উট নিয়ে আসা হয় তাদেরও মাথাও, মুখে, গায়ে আবির লাগিয়ে দেওয়া হয়। তারপর নির্দিষ্ট সময়ে শুরু হয় দৌড় প্রতিযোগিতা। স্বাভাবিকভাবেই পুরো এলাকা হয়ে ওঠে রীতিমতো তটস্খ সকলেই নিজের নিজের উটের জন্যে জয়সূচক ধ্বনি দিতে থাকেন। তাদের সমর্থকরাও সেই চিৎকার চেঁচামেচিতে অংশ নেয়। চারদিক থেকে আসা এই বিপুল চিৎকারের ফলে উটেরা আরও জোড়ে দৌড়তে থাকে। ফলে প্রতিযোগিতা যেন জমে ওঠে চরমে।
কোথাও কোথাও অবশ্য গরুর দৌড় প্রতিযোগিতাও হয়। তবে উঠের মতো তা এত জমে ওঠে না। গুজরাতে ডান্ডি নাচ তো আছেই। সেইসঙ্গে আছে রঙেরও বিপুল খেলা।
যমুনা নদীতে অনেকে দোলের আগের দিনই ছোট ছোট ভেলা বানিয়ে তাতে প্রদীপ জ্বেলে দিয়ে তা ভাসিয়ে দেন। সেই সম্মিলিত প্রদীপগুলি ভাসতে ভাসতে চলে আলোর আনন্দ বিচ্ছূরণ করে। খোদ ব্রজধামে ও মথুরায় দোল খেলার প্রস্তুতি শুরু হয়ে যায় আগের দিন রাত থেকেই। হোলিকা রাক্ষসী বধ করার জন্যে এদিন রাতেই পুরনো জিনিসপত্র সব পুড়িয়ে ফেলা হয়। আবর্জনা শেষ করার জন্যেই এই ব্যবস্থা।
উত্তর ভারতে মোটামুটিভাবে যে দু”টি উৎসব সবচেয়ে বেশি জনপ্রিয় তার মধ্যে একটি এই হোলি উৎসব। অন্যটি দীপাবলি। দীপাবলির মতো হোলিতেও আলো জ্বালানো হয়। মধ্যপ্রদেশের বিভিন্ন জায়গায় আলোর মালা জ্বালানো হয় এবং বাজিও ফাটানো হয়। ইন্দোরের হোলকার মন্দিরে এবং উজ্জ্বয়নীর মহাকালেশ্বর মন্দিরে সাধারণ মানুষ নিজের থেকে এসেই প্রদীপ জ্বালিয়ে যান। কেউ কেউ মোমবাতি নিয়ে আসেন এবং তাও জ্বালিয়ে রাখেন সারারাত। হোলির এই উৎসব বিভিন্ন পুরনো মন্দিরগুলিকে ঘিরেও পালন করা হয়। কর্নাটকেও প্রাচীন মন্দিরগুলিতে হোলির দিন সাজানো হয় আলো দিয়ে। বিহারের বিভিন্ন জায়গায় হোলি খেলার সঙ্গে নেশা করারও একটা সম্পর্ক থাকে। তবে তা ইদানিং অনেক কমে আসছে।
জলের সঙ্গে রং মিশিয়ে পিচকারি দিয়ে সেই রং ছুঁড়ে অন্যের গায়ে লাগানো বহু প্রাচীন রীতি। কালিদাসের কাব্যেও তার ইঙ্গিত আছে। বৈষ্ণব অনুসঙ্গেও রাধাকৃষ্ণের মধ্যে এই হোলি খেলার রীতি প্রচলিত ছিল এমন মনে করা হয়। রাধার সখীরাও তাতে অংশ নিতেন। মথুরা ও বৃন্দাবনে উৎসবের মাত্রা অনেক বেড়ে গেছে সেই অনুসঙ্গ থেকেই। যদিও কেউ কেউ জলের সঙ্গে রং মিশিয়ে খেলা খেলেন না। তাদের মধ্যে শুকনো ফাগ ও আবির নিয়ে খেলাই প্রচলিত রীতি। দক্ষিণ ভারতের বহু জায়গায় এই রীতি প্রচলিত আছে। বিশেষ করে তামিলনাড়ু, কেরলম ও অন্ধ্রপ্রদেশে শুকনো আবির খেলারই রীতি বেশি।
হোলি খেলার সঙ্গে গানের একটা গভীর সম্পর্ক আছে। আমাদের বাংলায় বৈষ্ণব কবিদের লেখা গানগুলি, বিশেষ করে যেগুলিতে বসন্তোৎসবের বর্ণনা আছে সেই কীর্তনগুলিই শ্রী খোল ও খঞ্জনী বাজিয়ে গাওয়া হয় মধ্যযুগ থেকেই। এই গানগুলির সঙ্গে যেমন বাঙালি রাধাকৃষ্ণকে স্মরণ করেন তেমনই স্মরণ করেন শ্রীচৈতন্য লীলাকে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর নির্মিত শান্তিনিকেতনে হোলিকে সম্পূর্ণ অন্যমাত্রা দিয়েছেন। বসন্ত ঋতু নিয়ে তাঁর লেখা বহু গান এই সময়ই বেশি গাওয়া হয়। হোলির আগের দিন থেকেই শান্তিনিকেতনের ছাত্রছাত্রী ও আবাসিকরা আসে হাতে মোমবাতি জ্বেলে নিয়ে। বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে পথ পরিক্রমা করেন। সারারাত ধরে চলে এই পথ পরিক্রমা। পরদিন সকাল থেকেই বিভিন্ন সাজে সজ্জিত হয়ে ছাত্রছাত্রীরা নাচ ও গানের মধ্যে দিয়ে গৌর প্রাঙ্গণ পর্যন্ত যান। মূলত গান হয়, “ওরে গৃহবাসী খোল দ্বার খোল/লাগলো যে দোল/রঙে রঙে বনতলে লাগল যে দোল” ইত্যাদি। পরে ছাত্রছাত্রীরা বিভিন্ন ভাগে ভাগ হয়ে নানা ধরনের গান, বাজনা ও নাচে মেতে ওঠেন। দুপুর পর্যন্ত সেখানে এই উৎসব চলতে থাকে। তবে শান্তিনিকেতনে কোনওভাবেই জলীয় রঙ ব্যবহার করা চলে না। হোলির দিন শান্তিনিকেতনের আবাসিক কোনও বাড়িতে গেলে তাঁরা অভ্যাগতকে মিষ্টিমুখ করাবেনই। বিশেষ করে ঘুগনি ও পায়েস তৈরি রাখা হয়। এককথায় বলা যায় শান্তিনিকেতন দোলের আগের দিন থেকেই দোলের দিন রাত পর্যন্ত রীতিমত মোহময় হয়ে ওঠে। একইসঙ্গে কলকাতা ও তার আশেপাশে হোলি উৎসবের কথা বললে অবশ্যই উল্লেখ করতে হবে তার আগের দিন রাতে ন্যাড়া পোড়ানোর কথা। তবে এখানে জলের রঙই বেশি খেলা হয়। ইদানিং অবশ্য নানা বিধিনিষেধের ফলে হোলি নিয়ে আপত্তিকর কাণ্ডগুলি অনেকটাই কমে গেছে। ফলে উৎসবের আসল রূপ ফিরে আসছে একটু একটু করে।