নিউজ

রাজবংশী ভাষায় স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ডাউকি’ এবার আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের আঙিনায়

Published by
News Wave India Desk
Share it

নিউজ ওয়েভ ইন্ডিয়া: উত্তরবঙ্গের রাজবংশী ভাষা, লোকঐতিহ্য ও সাংস্কৃতিক পরিচয়কে বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরার লক্ষ্য নিয়ে নির্মিত হয়েছে রাজবংশী ভাষার স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘ডাউকি’। অঙ্কিত বাগচীর প্রযোজনায় এবং শৌভিক পণ্ডিতের পরিচালনায় নির্মিত এই চলচ্চিত্রটি খুব শিগগিরই বিভিন্ন আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হতে চলেছে। নির্মাতাদের আশা, ছবিটি রাজবংশী ভাষা ও সংস্কৃতির দীর্ঘদিনের অবহেলার বিষয়টিকে আন্তর্জাতিক পরিসরে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ে আসবে।

‘ডাউকি’ শুধুমাত্র একটি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র নয়; এটি একটি ভাষা ও সংস্কৃতিকে বাঁচিয়ে রাখার শিল্পসম্মত প্রয়াস। ছবির মূল কাহিনিতে উঠে এসেছে এক রাজবংশী কবির সংগ্রামের গল্প, যিনি নিজের মাতৃভাষায় সাহিত্যচর্চা ও কবিতা প্রকাশের জন্য প্রতিনিয়ত লড়াই করে চলেছেন। ভাষাগত আধিপত্যের ফলে রাজবংশী ভাষাকে ‘উপভাষা’ হিসেবে দেখার প্রবণতা এবং তার ফলে একটি প্রাচীন জনগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক পরিচয়ের সংকট—এই বাস্তবতাকেই চলচ্চিত্রে সংবেদনশীলভাবে তুলে ধরা হয়েছে।

চলচ্চিত্রের গল্পে পারিবারিক স্মৃতি, লোকবিশ্বাস ও ঐতিহ্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। একজন বাবা তাঁর মেয়েকে রাজবংশী পুরাণের গল্প শোনান, যার মাধ্যমে ‘তিস্তা বুড়ির পুজো’ ও ‘মেচেনি খেলা’র মতো প্রায় হারিয়ে যেতে বসা ধর্মীয় ও লোকজ প্রথাগুলি জীবন্ত হয়ে ওঠে। এই উপস্থাপনা কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ নয়, বরং বিলুপ্তপ্রায় সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকার সংরক্ষণের এক আন্তরিক প্রয়াস।

ছবিটির শুটিং হয়েছে উত্তরবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার ময়নাগুড়ি এলাকায়। নির্মাণের বিভিন্ন পর্যায়ে স্থানীয় রাজবংশী শিল্পী, গবেষক এবং সাংস্কৃতিক কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছবিটিকে আরও বাস্তব ও সমৃদ্ধ করেছে। বিশিষ্ট গবেষক দীনেশ চন্দ্র রায়, সঙ্গীতশিল্পী দীপ্তি রায় এবং তুক্খা একাডেমির শিল্পীরা রাজবংশী লোকগান, কাহিনি ও সংস্কৃতিকে চলচ্চিত্রে তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। কার্যনির্বাহী প্রযোজক অনিন্দিতা রায় এবং তাঁর সংগীতদলের অবদানও ছবির সাংস্কৃতিক আবহকে আরও শক্তিশালী করেছে।

‘ডাউকি’ চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন পরিমল রায়, রিনা রায়, শ্রেয়সী রায়, বাপি রায়-সহ একাধিক স্থানীয় অভিনেতা-অভিনেত্রী। চিত্রগ্রহণ করেছেন কল্পতরু জানা। পাশাপাশি সুবীর রায়, রাজেশ রায়, সংঘমিত্রা রায় এবং প্রসেনজিৎ বর্মণের মতো শিল্পীদের সহযোগিতায় ছবির নৃ-সংস্কৃতিগত উপস্থাপনা আরও গভীরতা পেয়েছে।

চলচ্চিত্রটির নামও বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। রাজবংশী ভাষায় ‘ডাউকি’ শব্দের বাংলা অর্থ ‘ডাহুক পাখি’। যেমন ডাহুক আজ ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে, তেমনই রাজবংশী ভাষা ও সংস্কৃতিও হারিয়ে যাওয়ার আশঙ্কার মুখে। সেই প্রতীকী অর্থকে কেন্দ্র করেই নির্মাতারা ভাষা ও ঐতিহ্য রক্ষার বার্তা তুলে ধরেছেন।

ছবিতে ‘ডিকোলোনাইজেশন’ বা উপনিবেশিক সাংস্কৃতিক প্রভাব থেকে মুক্ত হয়ে নিজস্ব ভাষা, ইতিহাস ও ঐতিহ্য পুনরুদ্ধারের ধারণাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একটি সাধারণ রাজবংশী পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের ভেতর দিয়ে বহুদিন ধরে আড়ালে থাকা অসংখ্য লোককথা, ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক বাস্তবতাকে দর্শকের সামনে তুলে ধরেছে ‘ডাউকি’।

নির্মাতা ও প্রযোজনা সংস্থার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবগুলিতে অংশগ্রহণের সূচি খুব শিগগিরই আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা করা হবে। পাশাপাশি স্থানীয় সম্প্রদায়ের কণ্ঠস্বরকে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরা এবং রাজবংশী ভাষা ও সংস্কৃতির সংরক্ষণে ভবিষ্যৎ উদ্যোগ নিয়েও আলোচনা চলছে।

নির্মাতাদের বিশ্বাস, ‘ডাউকি’ আন্তর্জাতিক দর্শকের কাছে শুধু একটি চলচ্চিত্র হিসেবেই নয়, বরং ভাষাগত বৈচিত্র্য, সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র্য এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর পরিচয় রক্ষার সংগ্রামের এক গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে সমাদৃত হবে। একই সঙ্গে এই চলচ্চিত্র রাজবংশী ভাষায় আরও নতুন সৃজনশীল কাজের পথ খুলে দেবে এবং স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতির প্রতি নতুন প্রজন্মের আগ্রহ ও সচেতনতা বৃদ্ধি করবে।

Share it
News Wave India Desk

Share
Published by
News Wave India Desk

This website uses cookies.