নিউজ ওয়েভ ইন্ডিয়া: সারা দেশে বাঙালি বিদ্বেষ হঠাৎ রীতিমতো বেড়ে গেছে, এমনিতে কিছুদিন আগেও এই প্রবণতা দেখা যায়নি। গত কয়েক মাস ধরে পশ্চিমবঙ্গে যেসব পরিযায়ী শ্রমিক ভারতের অন্য রাজ্যে কাজ করতে যান তাঁদেরকেই মোটামোটিভাবে নির্দেশ করা হচ্ছে কোনও কোনও ক্ষেত্রে তাদের যাবতীয় নথি বাজেয়াপ্ত করে নিয়ে পুলিশ সোজা বাংলাদেশ সীমান্তে পাঠিয়ে দিচ্ছে সেদেশে ঢুকিয়ে দেওয়ার জন্য। এদের কারও কারও বাড়ি বীরভূম, মুর্শিদাবাদ এবং উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলায়। যেহেতু এই পরীযায়ী শ্রমিকরা অত্যন্ত সচেতন সেকারণে সঙ্গে করে নিয়ে যান নিজেদের যাবতীয় নথি যেমন আধার কার্ড, ভোটার আইডি কার্ড কিংবা প্যান কার্ড। অন্য কোনও ব্যক্তিগত নথি থাকলে তাও সঙ্গে রাখেন তাঁরা। কারণ জানেন অন্য রাজ্যে দরকার পড়লে সঙ্গে সঙ্গে সেইসব নথি দেখিয়ে নিজের পরিচয় অন্য রাজ্যের পুলিশের কাছে স্পষ্ট করতে পারবেন।
কিন্তু তাতে রেহাই হচ্ছে না। অন্য রাজ্যের পুলিশ এইসহ নথি দেখার পরেও সেগুলিকে জাল বলে দাগিয়ে দিচ্ছে এবং বাংলাদেশে পাঠাবার চেষ্টা করছে। এভাবে কয়েকজনকে বিএসএফ-এর মাধ্যমে বাংলাদেশে ঢুকিয়েও দেওয়া হয়েছিল কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের প্রশাসনের তৎপরতায় তাদের ফিরিয়ে আনা গেছে। মাঝখানে যে বিপুল উদ্বেগ ও হতাশা দেখা দিয়েছে তার জন্যে অন্য রাজ্যের পুলিশ এবং প্রাশাসনের কোনও মাথা ব্যথা নেই। এইসব ভুল ভ্রান্তির জন্যে তাদের দিক থেকে কোনও উচ্চবাচ্যও করা হচ্ছে না। এই অদ্ভুত পরিস্থিতি কেন অনেকেই সেটা বুঝতে পারছেন না।
কিন্তু বুঝতে না পারার কোনও কারণ নেই। সারা ভারতেই এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে কাজের খোঁজে যাওয়া আসা করেই থাকেন পরিযায়ী শ্রমিকরা। মহারাষ্ট্র থেকে গুজরাটে কিংবা গুজরাট থেকে মহারাষ্ট্রে, রাজস্থান থেকে কর্নাটকে কিংবা ওড়িশা থেকে তামিলনাড়ু, পুদুচেরি, তেলাঙ্গানা প্রভৃতি রাজ্যে পরিযায়ী শ্রমিকরা ব্যাপকভাবেই কাজ করতে যান। কিন্তু তাদের ক্ষেত্রে কোনও সমস্যা দেখা দেয়নি। তার কারণ এইসব রাজ্যের সীমান্ত বাংলাদেশের সঙ্গে নয়। বাংলায় কথা বললে যে তাদের বাংলাদেশী বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে এমন নয়। লক্ষ্য করার বিষয় হল কেবল পশ্চিমবঙ্গেই পরিযায়ী শ্রমিকদের ওপরই এই ধরনের অত্যাচারের খাঁড়া নেমে এসেছে এটা একদিক দিয়ে খুব স্বাভাবিক কিন্তু সেই স্বাভাবিকত্ব ওপর থেকে বোঝা যাচ্ছে না।
খেয়াল করতে হবে বাংলাদেশে যাদের ফেরত পাঠানো হচ্ছে তাদের প্রত্যেকেই পশ্চিমবঙ্গের বৈধ নাগরিক এবং স্বাভাবিকভাবে ধর্মে মুসলমান। এইধরনের বাংলাভাষী মুসলিম পরিযায়ী শ্রমিক কেবল পশ্চিমবঙ্গ থেকেই যাচ্ছেন এমন নয়। ত্রিপুরা এবং অসম থেকেও নিশ্চয়ই এমন শ্রমিক অন্য রাজ্যে কাজ করতে যান। কিন্তু তাদেরকে ধরাও হচ্ছে না। এবং বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোও হচ্ছে না। তার মানে ইচ্ছাকৃতভাবে পশ্চিমবঙ্গে বসবাসকারী নাগরিকদের বাংলাদেশী বলে চিহ্নিত করা হচ্ছে এবং সেই ওই প্রতিবেশী দেশে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। তার মানে জেনে শুনে এবং বৈধ নাগরিক প্রমাণপত্র দেশে এমন কাজ করা হচ্ছে এটা ধরে নেওয়াই যায়।
পরিযায়ী শ্রমিকরা পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিভিন্ন রাজ্যে বিভিন্ন কাজের জন্যে গিয়ে থাকেন। এবং এটা চলে আসছে স্বাধীনতা বহু আগে থেকেই। তাই আশ্চর্য হওয়ার কিছু নেই বা এর মধ্যে নতুনত্ব কিছু নেই। নতুন যেটা তা হল, পশ্চিমবঙ্গে আগামী বছর ভোট। এই ভোট হতে চলেছে সাত মাসের মধ্যেই এবং সেই ভোটে শাসক তৃণমূল কংগ্রেসকে পর্যুদস্ত করার জন্যে আটঘাঁট বেঁধে নেমেছে অন্য রাজ্যের পুলিশ ও প্রশাসন। এবং সে রাজ্যগুলি মূলত বিজেপি শাসিত। যদিও কেন্দ্রে বিজেপি একক শাসক দল নয়। তবু তাদের সমর্থক প্রধান দুটি দল এসব ব্যাপার নিয়ে মাথা ঘামায় না বলে বিজেপি একাই পশ্চিমবঙ্গের বিরুদ্ধে মাঠে খেলে যাচ্ছে। আর তার বলি করা হয়েছে মূলত পরিযায়ী শ্রমিকদের ফলে উদ্দেশ্য পরিষ্কার। বাঙালি বিদ্বেষ দেখিয়ে ভোটে এনে বিজেপি কি সত্যিই বাঙালিদের কাছে কোনও সম্মান বা বিশ্বাস আদায় করতে পারবে সমস্যা সেই প্রশ্নটি ঘিরেই। বিজেপি পরিষ্কারভাবে একটি বাঙালি বিদ্বেষী দল হিসেবে চিহ্নিত হয়ে গেছে এটা এখন পরিষ্কার বলে বিরোধী রাজনৈতিক মহলে চর্চা চলছে।
This website uses cookies.