শ্যামল মুখোপাধ্যায়: পতন অনির্বার্য ছিলই। বহু যুদ্ধের অগ্রজ সৈনিক তৃণমূল নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কেন যে পতনের সেই অনিবার্য “দেওয়াল লিখন” পড়তে শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হলেন- দীর্ঘ বছরের রাজনৈতিক সংবাদদাতা হিসেবে আমাদের মতো সাংবাদিক এবং অভিজ্ঞ বোদ্ধাদের তা কিছুতেই মাথায় আসছে না। এখনও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়, ফিরহাদ হাকিমদের পাশে বসিয়ে সাংবাদিক সম্মেলনে মমতা যে মন্তব্য করছেন, বা ‘ভোট লুটের’ গপ্পো ছড়াচ্ছেন তা যে রাজ্যের আপামর জনসাধারণের কাছে মোটেই বিশ্বাসযোগ্য হচ্ছে না-এটা বুঝতেও বা মেনে নিতেও রীতিমত ‘যন্ত্রণা হচ্ছে’ মমতা, যুবনেতা অভিষেক বা প্রাক্তন মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিমের। “আমি হারিনি-আমি লড়ে যাব, আমাকে জোর করে হারানো হয়েছে।”-এই সব বালখিল্য উক্তি যে কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন, রাজ্যপাল অর্থাৎ রাজ্য সরকার বা কেন্দ্রীয় সরকার যে মানছে না বা মানতে পারে না- এই বোধবুদ্ধিও লোপ পেয়েছে মমতা-সহ নেতৃবৃন্দের একাংশের। এমনকী দীর্ঘদিনের মমতার লড়াইয়ের সঙ্গী তৃণমূলের প্রথম সারির অভিজ্ঞ অনেক নেতাই যে মমতার এই সব বালখিল্য আচরণ, অসংলগ্ন উক্তি মেনে নিতে পারছেন না ইতিমধ্যেই তা স্পষ্ট হয়েছে। দলেরই এক প্রবীণ নেতা পুনরায় বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছেন। স্পষ্টভাষায় এই রাজনৈতিক সংবাদদাতাকে বলেছেন, “মানুষ ভোট দেননি, আমরা তার জন্যই হেরেছি। এই অবস্থায় বিরোধী দলে বসে ক্ষমতাসীন বিজেপি দলের ভুলত্রুটি নিয়ে বিধানসভার ভিতরে এবং বাইরে ব্যাপক প্রচারে নামব-এটাই তো হওয়া উচিত। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া, নীতিও তো এটাই বলছে।” দলেরই আরও এক সদ্য নির্বাচিত প্রবীণ বিধায়ক বলছেন, “গত বিধানসভায় ৭৭ জন বিধায়ক নিয়ে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী বিধানসভা কাঁপিয়ে দিয়েছিলেন। লাগাতার পাঁচ বছর রাস্তায় নেমে ধুন্ধুমার লড়াই বাঁধিয়ে দিয়েছিলেন। তারই ফলশ্রুতিতে বিজেপি দলের আজকের এই বিপুল জয়। আর আজ ২০২৬-এ তৃণমূল কংগ্রেসের ৮১ জন এবং বিরোধীদের সংখ্যা ধরা হলে সংখ্যাটি দাঁড়াচ্ছে কংগ্রেস ২, সিপিএম ২ এবং অন্যান্য ২- সব মিলিয়ে ৮৭ জন বিধায়ক নিয়ে তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর মতো কাঁপিয়ে দেওয়া যাবে না কেন? শুধু শুধু নিজেদের আরও হাস্যস্পদ করে তোলার কোনও মানে হয়?- প্রশ্নটি তৃণমূল দলেরই সদ্য নির্বাচিত নবীন প্রবীন বিধায়দেরই একাংশেরই।”
প্রসঙ্গত, মনে পড়ে ২০১১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফলের দিনের কথা। সিপিএম দলের রাজ্য অফিস আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সর্বশেষ প্রতিক্রিয়া জানার জন্য গিয়েছিলাম দুপুরের পর। গিয়ে দেখি তখনও মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রাজভবনের উদ্দেশে রওনা দেওয়ার তোড়জোড় করছেন। কেন? রাজ্যপালের হাতে তিনি পদত্যাগ পত্র জমা দিতে যাচ্ছেন। প্রশ্ন করি- এখনও তো পুরো ফলাফল নির্বাচন কমিশন সরকারিভাবে ঘোষণা করেনি, তাহলে এখনই পদত্যাগের প্রশ্ন কেন? গম্ভীর, থমথমে মুখে বুদ্ধবাবু স্পষ্ট বলেছিলেন, “ফলাফল এখনও পর্যন্ত যা ঘোষিত হয়েছে তাতে ‘জনাদেশ’ স্পষ্ট। আমাদের মানুষ প্রত্যাখ্যান করেছেন। এই অবস্থায় ক্ষমতায় বসে থাকাটা এক মুহূর্তও উচিত হবে না।” তিনি একবারও ‘জোর করে হারিয়ে দেওয়া’ বা ‘ভোট লুট হয়েছে’- এসব অপ্রাসঙ্গিক কথা একটাও উচ্চারণ করেননি। এই হচ্ছে নীতি-আদর্শের কথা। গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে শ্রদ্ধা জানানোর নিয়ম-শৃঙ্খলা। এখানেই বুদ্ধবাবু নিজেকে এবং তাঁর দলকে একটা বিশাল উচ্চতায় নিয়ে গেলেন। আর আজ? থাক, এই প্রসঙ্গ।
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সাংবাদিক হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে এই ধরনের অভূতপূর্ব ভোটদান ১৯৭৭ সাল বা ২০১১ সালের পর কখনই চোখে পড়েনি। অবশ্য এই দিনগুলিতেও ভোটের আগে এবং পরে খুনোখুনি, রক্তক্ষরণ, মারপিট-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে বহু জায়গায়। এবার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে দিয়েছে জাতীয় নির্বাচন কমিশন। একটিও খুনোখুনির ঘটনা ঘটেনি। নির্বাচনের আগে বা ভোটের দিন কোথাও ‘ট্যাঁ-ফু’ করতে দেননি নির্বাচন কমিশনের পর্যবেক্ষক, পুলিশ পর্যবেক্ষক এবং রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক ও তাঁর সহকর্মীরা। দুর্নীতি, অপশাসন, তোলাবাজি, সিন্ডিকেটরাজ, মহিলাদের ওপর পরপর নির্যাতনের ঘটনা বিশেষ করে বছরখানেক আগের আর জি কর হাসপাতালে মহিলা চিকিৎসককে ধর্ষণ এবং খুনের ভয়ঙ্কর ঘটনার বিরুদ্ধে মানুষ অর্থাৎ ভোটাররা নিঃশব্দে তাঁদের রায় জানিয়েছেন। এটা যে অনিবার্য ছিল তা আর জি করের ভয়ানক ঘটনার পর সবাই অনুভব করেছিলেন। ব্যতিক্রম মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। জনরোষ যে আছড়ে পড়তে চলেছে সেটা তৃণমূল দল এবং তার নেত্রী বুঝতেই পারলেন না- এটাই একজন রাজনৈতিক সাংবাদিক হিসেবে আমরা বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করেছি। আসলে ক্ষমতায় অন্ধ হয়ে থাকা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এই ক্ষেত্রে জনগণের ‘পালস’ বুঝতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছেন, এটা স্পষ্ট লিখে দেওয়া যায়। কিন্তু, অতীত অভিজ্ঞতায় বারবার লক্ষ্য করেছি মানুষের ‘মন’ মুহূর্তের মধ্যে বুঝে নেওয়ার আশ্চর্য ঐশ্বরিক ক্ষমতা ছিল মমতার। ক্ষমতা, অন্ধ স্তাবকতা, লোভ তাঁর সেই ক্ষমতা যে দ্রুত লোপ পাচ্ছে, কাছ থেকে তা অনুভব করতে পেরেছি বারবার। সৎ উপদেশও কানে তুলতেন না তিনি, এটাও প্রত্যক্ষ করেছি। শেষ দিকটায় তো অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের মতো আচরণ করছেন, এটাও লক্ষ্য করেছি।
এবারের বিধানসভা ভোটে শতকরা হিসেবেই স্পষ্ট বিজেপি দলের সঙ্গে তৃণমূল কংগ্রেসের ভোটের শতকরা ব্যবধান দ্রুত যে বাড়ছে এই পরিসংখ্যানটিও বুঝতে পারছেন না বা বুঝতে চাইছেন না দলনেত্রী। এবারের বিধানসভা নির্বাচনে ভোটের শতকরা হিসেবে যেখানে বিজেপি ৪৫.৮৪ শতাংশে অর্থাৎ ৪৬ শতাংশে পৌঁছে গিয়েছে সেখানে দীর্ঘ ১৫ বছর এক নাগাড়ে রাজত্ব চালানোর পরেও তৃণমূল কংগ্রেসের প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হিসেব নেমে এসেছে ৪২ শতাংশে। বিজেপির ভোট বেড়েছে ৬ শতাংশেরও বেশি। আর কংগ্রেস বা সিপিএম শূন্যের গেরো আপাতত কাটালেও তাদের প্রাপ্ত ভোটের শতকরা হিসেব আরও কমেছে। দূরবীন দিয়ে তা নজরে আনতে হয়। বামেদের ঝুলিতে পড়েছে মাত্র ৫.৩ শতাংশ ভোট। কংগ্রেস পেয়েছে মাত্র ৩ শতাংশ ভোট। এই সব পরিসংখ্যান নিয়ে পরিবর্তী সংখ্যায় বিস্তারিত জানাব। সর্বভারতীয় এই দুই দলের হাল কেন এমন হল?- এ সব নিয়েও ব্যাখ্যা করব আগামী সংখ্যায়।
This website uses cookies.